শিল্পাঞ্চলে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালন
আমার কথা, ২১ ফেব্রুয়ারী
প্রণয় রায়, দুর্গাপুর:
সকালে বাড়ি থেকে বেরিয়ে এডিসন রোডে ভাষা শহীদ ময়দানের উদ্দেশ্যে যাচ্ছিলাম।কারণটা আর কিছুই না আজ আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস।
বাড়ি থেকে বের হতেই কয়েকটি অল্পবয়সী ছেলের সঙ্গে দেখা হল। ওরা ইংরেজি,হিন্দি ও বাংলার জগাখিচুড়ি ভাষায় পরস্পরের মধ্যে কথা বলছিল। ছেলেগুলিকে প্রতিদিন সকাল ও দুপুর এ রাস্তা দিয়ে সামনের একটা বাড়িতে টিফিন খেতে যেতে দেখি। আমাদের পাড়ায় আশেপাশে অনেকগুলো খালি বাড়ি এখন গার্লস আর বয়েজ হোস্টেলে পরিনত। দূরদূরান্ত থেকে এখানে কিছু নামকরা কোচিং স্কুল কাম সেন্টারে অনেক ছেলেমেয়ে ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার কোচিং নিতে এসেছে। ওদের মা বাবা ওদের এখানে রেখে গেছে।ছেলে গুলিকে প্রতিদিন সকাল বিকাল এ রাস্তা দিয়ে যেতে যেতে কথা বলতে দেখি।
আজ ওদের সঙ্গে একটু কথা বলতে ইচ্ছে হল। আলাপ করে জানলাম ওদের মধ্যে বেশিরভাগ ছেলেই বাঙালি। ওরা আমাকে চেনে কারণ ওরা প্রতিদিনই আমাকে এই রাস্তা দিয়ে চলতে গিয়ে দেখে। তাই ওদের ডেকে
একটু আগ্রহ নিয়ে বললাম আজ কত তারিখ বলতো? একজন বললো আঙ্কেল আজ একুশ তারিখ। আমি বললাম বলতো আজকের দিনটা কি জন্য বিখ্যাত? একজন বললো আজ তো কোন হলিডে নেই। আমাদের কোচিং সেন্টার ও বন্ধ নেই। জানিনা আঙ্কেল আজকের দিনটা কিসের জন্য বিখ্যাত? আমি বললাম আজ আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস।ওরা আমার মুখের দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকায় আমি বললাম আজ ইন্টারন্যাশনাল মাদার ল্যাঙ্গুয়েজ দিবস। ওরা মাথা নেড়ে বলল ওরা একথা জানেনা। আমি বললাম মাতৃভাষা নিয়ে এদিনের সেই রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের ইতিহাস শুনবে? ওদের একজন আমাকে বলল আঙ্কেল এখনই টিফিন খেয়ে আমাদের এডুকেশন সেন্টারে যেতে হবে। পরে গুগুলে দেখে নেব।
আমি বললাম তোমরা যাও।
মনে একটু কষ্ট নিয়ে এডিসন মেজর পার্কর দিকে এগোচ্ছিলাম। দেখলাম শাড়ি পরা, পোশাক পরা বেশ কয়েকটি অল্পবয়সী মেয়ে পার্কের দিকে হেঁটে যাচ্ছে। স্কুটি থামিয়ে ওদের জিজ্ঞাসা করলাম কোথায় যাচ্ছ? ওরা বলল ভাষা দিবসের অনুষ্ঠানে। এডিসন মেজর পার্কে ঢুকলাম। যে ভাষাকে ভালবেসে ১৯৫২ সালে তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের(বর্তমান বাংলাদেশ) ঢাকায় রফিক সালাম, বরকত,আবদুল জব্বাররা জীবন দিয়েছিল আর যাদের আত্মদানে মাতৃভাষা একদিন আন্তর্জাতিক মাতৃভাষার স্বীকৃতি পেল এ দিনটা এলে আমার নিজের প্রাণের ভাষার এত বড় স্বীকৃতির জন্য গর্বে বুকটা ভরে ওঠে ঠিক তেমনি এখনকার নবীন প্রজম্মকে দেখে সদ্য প্রয়াত কবি ভবানী প্রসাদ মজুমদারের সেই বিখ্যাত কবিতাটা মনে পড়ে যায় জানেন দাদা আমার ছেলের বাংলাটা ঠিক আসেনা। ইংলিশ ওর গুলে খাওয়া,ওটাই ফাস্ট ল্যাঙ্গুয়েজ, হিন্দি সেকেন্ড, সত্যি বলছি হিন্দিতেওর দারুণ তেজ।কি লাভ বলুন বাংলা পড়ে।
এ যেন এখনকার অনেক মা বাবার গর্বিত স্বীকারোক্তি। বড় কষ্ট হয়।এক বুক কষ্ট নিয়ে ভাষা শহীদ ময়দানে ঢুকলাম। আজ খুব ভোরে বাংলাদেশের ঢাকা থেকেআমার বাংলাদেশী বন্ধু ভাষা দিবসের শুভেচ্ছা জানিয়েছে হোয়াটসঅ্যাপে। পাঠানো ভিডিওতে দেখলাম খুব ভোর থেকে কত প্রভাতফেরী চলেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলা প্রাঙ্গনে শহীদ মিনারের উদ্দেশ্যে। ওর পাঠানো প্রভাতফেরীর ভিডিও দেখে মনে পড়লো আল মামুদের ২১ ফেব্রুয়ারী নিয়ে সেই বিখ্যাত কবিতা প্রভাত ফেরী প্রভাত ফেরী আমায় নেবে সঙ্গে। বাংলা আমার বচন জন্মেছি এই বঙ্গে।
না দুর্গাপুরের ভাষা শহীদ স্মারক ময়দানে প্রভাত ফেরী না হলেও দেখলাম সাত সকালে গোটা মাঠ জুড়ে অসংখ্য ভাষা প্রেমী মানুষের ভীড়। শহীদ বেদিতে সবাই পুষ্পার্ঘ অর্পণ করছেন।লহরী সঙ্গীত দল সমবেত কন্ঠে গাইলো আবদুল গাফফার চৌধুরীর লেখা ও শহীদ আলতাপ মাহমুদ এর সুরারোপিত একুশে ফেব্রুয়ারির প্রাণের সঙ্গীত আমার ভায়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি আমি কি ভুলিতে পারি।
মনটা উদ্বেলিত হয়ে উঠল সেই ভাষা শহীদদের আত্মদানের কথা স্মরণ করে। অতুল প্রসাদ সেনের মোদের গরব মোদের আশা আমরি বাংলা ভাষা গানটা শুনে মনে পড়ছিল ১৯৫৫ সালে শিলচরের সেই দশটি ভাই চ্ম্পা আর এক বোন পারুলের শুধুমাত্র মাতৃভাষার দাবীতে আত্মদানের কথা।
ভাষা শহীদ স্মারক ময়দানে কত মানুষের ভীড়। কত কথা, কত গান, কত কবিতা এযেন মিলে সুর মিলে হমারা। রবীন্দ্র সাহিত্য বিশেষজ্ঞ ও বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ সুচিন্ত্য চট্টরাজ, বিশিষ্ট নাট্য ব্যক্তিত্ব দীপক দেব, রনজিত গুহ, স্নেহাশিস মুখোপাধ্যায়, রাজীব ঘাঁটি, সোনালী বড়ুয়া
সহ অন্যান্যরা ভাষা শহীদদের বেদিতে পুষ্পার্ঘ্য অর্পন করলেন। শ্রী দীপক দেব বললেন আমাদের মাতৃভাষাকে সযত্নে লালন পালন করে হিংলিশ বাংলিশের হাত থেকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে। তিনি স্মরণ করেব বরাক ভাষা আন্দোলনের ভাষা শহীদ কমলা ভট্টাচার্যদের কথা। বলেন মাতৃভাষা নিয়ে ওদের আত্মত্যাগের কথা ভুললে চলবে না।
সুচিন্ত্য চট্টরাজ মাতৃভাষা দিবসের তাৎপর্য নিয়ে প্রাঞ্জল বক্তব্য রেখে বললেন বাংলা ভাষা কে এক বিশ্ব নাগরিক ভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠা দিয়েছেন রবীন্দ্রনাথ ও ঠাকুর পরিবার। প্রতিটি বর্ণমালা বিজ্ঞান । আমাদের মাতৃভাষাকে সযত্নে লালন পালন করে বাঁচিয়ে রাখতে হবে আগামী প্রজম্মের জন্য। দেশাত্মবোধক সঙ্গীত,সমবেত আবৃত্তি সব কিছু মিলিয়ে এক সুন্দর অনুষ্ঠানের সাক্ষী রইলাম। মোদের গরব মোদের আশা আমরি বাংলা ভাষা এ ভাষাতেই যেন আমরা নিরন্তর অবগাহন করতে পারি তবেই ভাষা শহীদদের আত্মত্যাগ সফল হবে।
আমি দূর আমেরিকায় দেখেছি প্রবাসী বাঙালীদের কিভাবে নিজের ভাষাও সংস্কৃতি বাঁচিয়ে রাখার আপ্রাণ প্রয়াস।
রনজিত গুহকে দেখলাম স্বপ্নের কড়িডোরের লিটল ম্যাগাজিন স্টলে বসে পরম মমতায় বাংলা বই বিক্রি করছেন। মনে পড়ল কাল বিকেলে কলকাতার সউথ সিটি মলের একটা পুস্তক বিপনীতে আবুসোনা অনেকগুলো বই কিনলো ওর মায়ের সঙ্গে। বললো বইগুলো ও নিয়ে যাবে। স্কুলের পড়ার ফাঁকে পড়বে।
কাঠগোড়িয়া স্কুলের ছাত্রীদের সেজেগুজে বসে থাকতে দেখলাম। ওদের জিজ্ঞাসা করতেই কলকলিয়ে বলল আমরা ভাষা দিবসের উপর নাচ করব। ভাষা দিবসের উপর কত নাচ, গান, আবৃত্তি পরিবেশিত হচ্ছিল। এডিসন রোডের ভাষা শহীদ উদ্যান মাতৃভাষা প্রেমীদের জমায়েতে ভাষা শহীদদের জানালো গানে কবিতায় জানাল বিনম্র শ্রদ্ধা।



