মেঘেদের আলয় “মেঘালয়”- পার্ট ১
আমার কথা, প্রণয় রায়, ৯ সেপ্টেম্বর:
“ভ্রমণ কথা”

শিউলি ফুলের সুবাস আমার মনকে এক সুদূর অতীতে নিয়ে যায়। শিউলি না শেফালি কি নাম ছিল তার আজ আর মনে নেই। আজ শিশির সিক্ত পথে শরতের সকালে ঘর থেকে বের হতেই দেখলাম আমাদের বাড়ির আঙিনা জুড়ে ঝরা শিউলি ফুলের মেলা। দুটো ফুল হাতে নিয়ে আঘ্রাণ নিলাম কি মিষ্টি সুবাস। বুঝলাম বৎসরান্তে মা আসার সময় হয়ে গেছে। আর পুজো এলেই আমার কলেজ জীবনের সেই শিউলি না শেফালি কি যেন নাম সুগন্ধি ফুলের মত এক কিশোরীর কথা মনে পড়ে। ফর্সা দোহারা চেহারা।মাথার দুদিকে চুলের বিনুনি ঝুলিয়ে সেই সময়ের বিখ্যাত বাংলা ছায়াছবি বালিকা বধূর নামে বাজার জুড়ে ছড়িয়ে পড়া নয়া ফ্যাশানের পুজোর শাড়ী পরে আমাকে বলছে চল ইছামতী নদী পেরিয়ে কাশফুল দেখতে বেরিয়ে পড়ি। আমি বললাম নদী পেরিয়ে কি করে যাব? ও বললো কেন ঘাটে অজিত কাকার ছোট্ট নৌকা বাঁধা আছে। আমি বললাম না বলে নৌকা নিলে যদি কাকা বকে? কিশোরী মেয়েটা বলল কাকা তো জানতেই পারবে না। শরতের এই অসময়ের বৃষ্টিতে কাকার ঠান্ডা লেগেছে। এর উপর কাকার তো অফিস আছে। আমি বললাম তোর কাকা তবে নৌকা দিয়ে কি করে? কিশোরী সেই মেয়ে বলে কাকার সখ ছুটির দিনে নৌকা করে ইছামতী নদীতে বরশি দিয়ে মাছ ধরা। আমার বাবাও তো মাঝে মাঝে কাকার সঙ্গে যায়। এরপর বলে আমিও। কাকাই আমাকে নৌকা চালাতে শিখিয়েছে। কাকা বলে ঘুরতে হয় তবেই তো দুনিয়াটা দেখা যায়।কত নতুন কিছু জানা যায়। আমাকে বলে চল আজ আমরা ইছামতী ন দীতে নৌকা বাইতে বাইতে ওই দূরে ওপারে চলে যাব।কতো কাশ ফুল নিিয়ে আসবো। আমি বললাম আমি তো নৌকা বাইতে জানি না। ও বললো আমি শিখিয়েে দেব। আমার প্রথম যৌবনে সেই কিশোরী মেয়েটার সাথে ইছামতীতে নৌকা বাইতে বাইতে কতদিন আমরা কতদূর চলে যেতাম। ওর কাকার কথা ঘুরতে হয় তবেই তো দুনিয়াকে জানা যায় এ কথাটা আমার মনে তখন থেকে গেঁথে গেল। আর এভাবেই আমার মধ্যে বেড়ানোর নেশা ধরিয়ে দিল মেয়েটা। প্রথম যৌবনের রঙ। সবটাই রঙীন। । এরপর না এর আর পর নেই।আর আমিতো কোন প্রেমের গল্প লিখতে বসিনি। আর সেই মেয়েকেও আর খুঁজে পাইনি। আজ সকালে শিউলি ফুলের গন্ধে মনে পড়ল ঐ মেয়েটা সেই যে আমার মধ্যে ভ্রমণের নেশাটা ধরিয়ে দিল তারপর একজীবন ধরে শুধু ঘুরেই চলেছি। আজ সকালে আমার বাড়ির সামনে ঝরা শিউলি ফুলের মধ্যে দিয়ে চলতে চলতে আকাশের দিকে তাকালাম। আকাশ জুড়ে ছেঁড়া মেঘের সারি। পুজো আসছে। আমার মনেও ছেঁড়া মেঘের মত পালাই পালাই ভাব। পায়ের তলায় শর্ষে নিয়ে আবার বেরিয়ে পড়লাম। এবার মেঘ বৃষ্টি খুব জ্বালাচ্ছে। সেই কতদিন হয়ে গেল। রোদ্দুর মাঝে মাঝে মেঘের ফাঁকে মুখ দেখিয়েই পালিয়ে যাচ্ছে।
বোলপুর স্টেশনে দাঁড়িয়েছিলাম।
নীল আকাশ, মেঘ, রোদ্দুর সব মাখামাখি। সামনেই শান্তিনিকেতন। গুরুদেব রবীন্দ্রনাথ যেন বললেন যাচ্ছিস যা শিলং এ শেষের কবিতার অমিত রে আর লাবণ্যকে দেখে আসিস।
মনে মনে বললাম যাবার তো খুব ইচ্ছে কিন্তু ওদের ঠিকানাটা মনের ডায়রী থেকে কোথায় যে হারিয়ে ফেললাম।
আমাদের ভ্রমণ গাইড দ্য ট্রাভেলার্স এর গৌতম মজুমদার।গৌতমের সাথে মাঝে মাঝেই বেরিয়ে পড়ি। সেই ফর্সা দোহারা মাথার দুদিকে বিনুনি করা কিশোরী মেয়েটার সাথে ইছামতী নদীতে নৌকা বাইতে বাইতে কি যে এক ঘোরার নেশা পেয়ে বসেছিল এরপর একজীবন ধরে ঘুরেই চলেছি আর খঁজে বেড়াই সেই মেয়েটাকে যে আমার ভ্রমণের নেশা ধরিয়ে দিয়ে বলেছিল ঘুরতে হয় তবেই তো কত কিছু জানা যায়। বোলপুর স্টেশনে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে এসব কথা ভাবছিলাম আর আকাশ জুড়ে ছেঁড়া মেঘের সাথে মিতালী করছিলাম ঠিক দুপুর সাড়ে এগারোটায় কাজিরাঙা এক্সপ্রেস এসে বোলপুর স্টেশনে ঢুকলো। বি ১ কোচ। আমি ও আমার স্ত্রী সিনিয়র সিটিজেন হওয়ার দৌলতে দুজনেই লোয়ার বার্থ পেলাম। সিটে বসেই আলাপ হয়ে গেল আমার পাশের সিটে বসা একটি ছেলের সঙ্গে। নাম সন্তু। মেকানিকাল ইঞ্জিনিয়ার। গুয়াহাটি চলেছে কিছু অফিসিয়াল কাজে।সাথে ইচ্ছে আছে কামাখ্যা দর্শন। জমে গেল আমাদের গল্প। ছেলেটা ঘুরতে ভালবাসে। আমাদের সঙ্গে যোগ দিলেন শিলং এর বাসিন্দা মাফুজর রহমান। তিরিশ বছর ধরে শিলং আছেন। বাঙালী।শিকড় কলকাতায়। কিন্তু এখন প্রবাসী বাঙালী। কথাবার্তায় খাসি ভাষার টান। ওনার কাছে মেঘালয়ের খাসি মানুষদের জীবনযাত্রা নিয়ে অনেক কিছুু জানলাম। এ নিয়ে পরবর্তী লেখায় জানাব।
আমাদের সঙ্গে যোগ দিলেন অসমিয়া মাঝবয়সী নীতিন বরা। ভারি মজার মানুষ। আমি বললাম কামাখ্যা দর্শন করতে চাই। উনি বললেন পান্ডার ব্যবস্থা করে দেবেন। পান্ডার ফোন নম্বর ও দিলেন। সাথে ওনার ও ফোন নম্বর।বললেন কোন প্রয়োজন হলেই যোগাযোগ করতে। ঝরঝরে বাংলা বলেন। মাঝে মাঝে পকৌড়া বিক্রি করতে আসা রেলের ভেন্ডারের কাছ থেকে পকৌড়া ও সামোসা কিনে খাওয়া। সাথে সাথে চা কফি তো চলছেই। কোথা দিয়ে দীর্ঘ ও ক্লান্তিকর যাত্রার সময়টা গল্পে গল্পে কেটে গেল তা বুঝতেই পারলাম না। ঘর থেকে বাইরে বের হলে কত অপরিচিত মানুষ এর সাথে আলাপ হয় কত কিছু জানা যায়। রাতে বাড়ি থেকে আনা হালকা খাবার খেয়ে একটু ঘুমানোর চেষ্টা করলাম। ভোর সাড়ে তিনটায় গুয়াহাটি পৌঁছালাম। ক্লান্ত শ্রান্ত হয়ে স্টেশনের ওয়েটিং রুমে সবাই বিশ্রাম নিলাম। ভোরের আলো ফুটলে আমরা শিলং এর উদ্দেশ্যে রওনা দেব। আর মনের মধ্যে শিউলির গন্ধ ছড়ানো মেয়েকে অনুভব করবো যে আমাকে প্রথম ঘোরার নেশা ধরিয়ে দিয়েছিল।
একসময় রাতের অন্ধকার কেটে গেল। সকাল হল। স্টেশন জুড়ে যাত্রীদের ব্যস্ততা, কুলী হাঁকাহাঁকি, পর পর এক একটা প্লাটফর্ম জুড়ে ট্রেন আসা ও স্টেশন ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়া, কোন যাত্রী ফ্রেশ শরীর ও মন নিয়ে ট্রেন ধরতে আসছে আর আমাদের মত অনেকে ক্লান্ত শরীর ও বাসি মন নিয়ে স্টেশনের বাইরে বের হচ্ছে গন্তব্য স্থানের যানবাহন ধরতে। সে এক মনে রাখার মত দৃশ্য। আমরা স্টেশনের বাইরে এলাম।আমাদের মাপত্র সেই যে বাড়ি থেকে বের হবার পর থেকে গৌতমের ছেলেদের
জিম্মায় আছে এরপর আর সারা পথ চিন্তা করতে হয়নি। ওরাই সবারআ মালপত্র ট্রেনে তুলছে সবার সিটের পাশে রেখে যাচ্ছে আবার গুয়াহাটি স্টেশন আসার আগেই আমাদের মালপত্র নিজেদের জিম্মায় নিয়ে ট্রেন থেকে নামানো এরপর শিলং যাবার গাড়ীতে তোলা এমন কি শিলং পোঁছে হোটেলে ঘরে ঘরে মালপত্র তুলে দেওয়া সবই ওরা সুষ্টুভাবে করে।প্রতিটা টুরেই ওরা এ কাজগুলো করে। আমরা সকাল সাড়ে সাতটায় শিলং যাবার বাসে চাপলাম। চার নম্বর জাতীয় সড়ক ধরে গাড়ী এগিয়ে চলেছে। কিছুটা এগোতেই ওয়েলকাম টু মেঘালয় লেখা বোর্ড। এক জায়গায় একটু দাঁড়িয়ে চা টিফিন খেলাম। মেঘালয়ে ঢোকার পর দেখলাম এখানকার সব দোকানপাটে বিক্রেতা মহিলা। সবাই ঝরঝরে ইংরেজী বলছে টুরিস্টদের সঙ্গে।এমনকি রাস্তায় ট্রাফিক পুলীশ ও মহিলা।পাহাড়ী রাস্তা। চারধারে পাহাড়ের সারি। যত পাহাড়ের উপরে উঠছি চারধারে সবুজ গাছপালা,মেঘলা আকাশ। মাঝে মাঝে রোদ্দুর। প্রচুর দেওদার ও ফার্ণ গাছ। কিন্তু পাহাড়ী রাস্তা জুড়ে প্রচন্ড জ্যাম। যত উপরে উঠছি তত প্রকৃতি মনোরম হচ্ছে।
বুঝলাম মেঘেদের দেশের কাছাকাছি পৌঁছে গেছি। সেই নাম ভুলে যাওয়া শিউলি ফুলের নামে নাম মেয়েটির কিশোরী অবয়ব যেন আমার মনের সামনে ভেসে উঠল। ও যেন বলল দেখলে তো তোমার মধ্যে কেমন ঘোরার নেশা ধরিয়ে দিলাম। আমি মনে মনে বললাম দিয়েছ তো। এখন এই অব্দি।



