কারুর হাসি কারুর চোখের জল, ছোট্ট মধুস্মিতা বেঁচে থাক সঞ্জিত মিঠুন অভিষেকের মাঝে

(লিভার গ্রহীতা সঞ্জিত বালা)
আমার কথা, ১৯নভেম্বরঃ

কারুর চোখের জল কারুর মুখে যে হাসি ফোটাতে পারে তার জ্বলন্ত সাক্ষী হয়ে রইল এই রাজ্য, দুর্গাপুরের চোখের জল বিধাননগরের ইমনকল্যাণ সরনীর পনেরোশো মোড়ের ডানদিক ঘুরে শাস্ত্রী অ্যাভিনিউ, মুচিপাড়া হয়ে ২নং জাতীয় সড়ক ধরে পানাগড় বাইপাস হয়ে, বর্ধমান বাইপাসে উঠে সেখান থেকে দুর্গাপুর এক্সপ্রেসওয়ে হয়ে মোট ১৭০ কিলোমিটার দীর্ঘ গ্রিন করিডর পথ অতিক্রম করে কলকাতায় এসএসকেএম হাসপাতালে গিয়ে কারুর মুখের হাসি হয়ে ফুটে উঠল। হ্যাঁ এটাই বাস্তব সত্য। আর তার সাক্ষী হয়ে রইল দুর্গাপুর শিল্পাঞ্চল।

ছোট্ট মেয়ে মধুস্মিতার শরীরের বেশ কিছু অঙ্গ প্রতিস্থাপিত হল এই রাজ্যেরই কয়েকজনের শরীরে। সন্ধ্যে সাড়ে সাতটা নাগাদ দুর্গাপুরের বিধাননগরের ওই বেসরকারী হাসপাতাল থেকে মধুস্মিতার কিডনি, লিভার ও কর্ণিয়া নিয়ে রওনা দেন চিকিৎসকের দল কলকাতার উদ্দ্যেশে। রাত নটা চল্লিশ নাগাদ তারা এসএসকেএম হাসপাতালে পৌঁছন। সেখানে আগে থেকেই প্রস্তুত ছিলেন গ্রহীতারা। মধুস্মিতার লিভার পেয়েছেন ব্যারাকপুরের বাসিন্দা সঞ্জিত বালা। মধুস্মিতার কিডনি পেয়েছেন মিঠুন দালাল ও অভিষেক মিশ্র।

সিদ্ধান নেওয়াটা খুব সহজ ছিল না তেরো বছরের ছোট্ট মধুস্মিতার বাবা মায়ের পক্ষে। নাড়ী ছেঁড়া সন্তানের শরীরের থেকে অঙ্গ আর কাউকে দান করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত যে সত্যিই কতটা শক্ত ছিল তা বোঝা গেল যখন হাসপাতাল থেকে হোট্ট মধুস্মিতার অঙ্গ নিয়ে চলে যাওয়া গাড়িটার দিকে তাকিয়েই হাসপাতালের মেঝে লুটিয়ে পড়েন মধুস্মিতার মা অর্চনাদেবী। সংজ্ঞা হারান তিনি। অসুস্থ হয়ে পরেন মধুস্মিতার বাবা দিলীপবাবু।

বাঁকুড়ার মেজিয়ায় সিআইএসএফ কর্মী হিসেবে কর্মরত দিলীপ বায়েন আসামের বাসিন্দা। ছোট থেকেই স্নায়ু রোগে আক্রান্ত ছিল বায়েন দম্পতির বড় মেয়ে। কিন্তু তার আয়ু রেখা যে এত ছোট সেটা হয়ত দুঃস্বপ্নেও ভাবেননি দিলীপবাবুর পরিবার, ভাবতে পারা সম্ভবও নয়। কিন্তু সেই অঘটনই ঘটল যখন ১৬নভেম্বর দুর্গাপুরের ওই হাসপাতালের চিকিৎসক ঘোষণা করেন যে, মধুস্মিতার ব্রেন ডেথ হয়ে গেছে। তাদের সন্তান ক্ষণজীবি হলেও সে বেঁচে থাকবে আর কারুর শরীরে, আর কারুর আত্মায়। সেই ভাবনা থেকেই বুকে পাথর চাপা দিয়ে বায়েন দম্পতি সিদ্ধান্ত নেন মধুস্মিতার অঙ্গদানের।

গতকাল রাত ১০নাগাদ ছোট্ট মধুস্মিতার দেহটি সাদা কাপড়ে মুড়ে যখন বাঁকুড়ায় তাদের আবাসনে গিয়ে পৌঁছয়, তখন তাকে শেষ দেখা দেখতে ভেঙ্গে পড়ে আবাসনবাসীরা। অনেক বড় কাজ করলেন দিলীপবাবু আর তাঁর স্ত্রী, যার সাক্ষী হয়ে রইল শিল্পাঞ্চল দুর্গাপুর থেকে শুরু করে চারটি জেলা, যে জেলাগুলির ওপর দিয়ে মধুস্মিতার অঙ্গ গ্রিন করিডর দিয়ে গিয়ে পৌঁছয় কলকাতায়। জেলার ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা হয়ে থাকবে মধুস্মিতার নাম। 

  

পাশাপাশি এই বিরাট কর্মকান্ডের পেছনে যাদের নিঃস্বার্থ অবদানের কথা মনে রাখার মতো তারা হলেন এই রাজ্যের পুলিস প্রশাসন ও বিধাননগর ও কলকাতার দুটি হাসপাতালের পুরো টিম। এই দীর্ঘ ১৭০ কিলোমিটার গ্রিন করিডর তৈরী করে পুলিশ প্রশাসন যে নজির গড়ল তা এককথায় অনিস্বীকার্য।




Spread The Word