মেঘেদের আলয়, ‘মেঘালয়’-পার্ট ২
আমার কথা, প্রণয় রায়, ১৪ সেপ্টেম্বরঃ
ভ্রমণ কথা
গুয়াহাটি স্টেশন থেকে আমরা একটা কুড়ি সিটের বাসে চেপে মেঘালয় চলেছি। সকাল সাড়ে সাতটায় বাস ছাড়লো। আকাশে রোদ। সকালেই গরম লাগছিল।শুনলাম অসমে এবার তেমন বৃষ্টি এখনও পর্যন্ত হয়নি। গুয়াহাটি ছেড়ে যত এগিয়ে যাচ্ছিলাম তত বাড়ি ঘর এর সংখ্যা কমছিল। একটু একটু করে রাস্তার দুপাশে গাছপালার সংখ্যা বাড়ছিল। এরপর যত এগিয়ে যাচ্ছিলাম দূরে দেখা যাচ্ছিল পাহাড়ের সারি। একসময় পাহাড়গুলো কাছে আসতে শুরু করলো। রাস্তার একপাশে পাহাড় অন্য পাশে জঙ্গল খাদ সব পেরিয়ে আমরা এগিয়ে যাচ্ছিলাম। আমাদের এই ভ্রমণের পরিচালক গৌতম মজুমদার। ওর এই টুরে প্রায় সবাই সিনিয়র সিটিজেন। ওর সাথে আমি এর আগেও অনেকগুলো দুর্গম জায়গায় ভ্রমণ করেছি।সুন্দর ব্যবস্থাপনা।
আমাদের বাস যত এগিয়ে চলেছে ততই নির্জন পাহাড়ী রাস্তা। আকাশে মেঘের আনাগোনা।
সংস্কৃতে মেঘালয় শব্দের অর্থ হল মেঘের নিবাস বা
মেঘের আলয়। পূর্বে মেঘালয় অসমের অংশ ছিল। কিন্তু ১৯৭২ সালের ২১ জানুয়ারী খাসি, গারো আর জয়ন্তীয়া জেলা নিয়ে মেঘালয় রাজ্য গঠিত হয়। মেঘ পাহাড় ও ঝর্ণার দেশ উত্তর-পূর্ব ভারতের মেঘালয়। চারদিকে উঁচু পাহাড় হাত বাড়ালেই মেঘের পরশ।পাহাড়ের বুক থেকে নেমে এসেছে অসংখ্য ঝরনা। ছবির মত সুন্দর সব গ্রাম। পাহাড়, জঙ্গল সব কিছু নিয়ে প্রকৃতির অনাবিল সৌন্দর্যে ভরা মেঘালয়। মেঘালয়ের রাজধানী শিলংকে বলা হয় প্রাচ্যের স্কটল্যান্ড। শিলং পেরিয়ে জয়ন্তিয়া পাহাড় সংলগ্ন ডাউকীর কাছেই বাংলাদেশের সিলেট সীমান্ত।
ঘন্টা দুয়েক পাহাড়ী পথ ধরে চলতে চলতে একজায়গায় এসে আমাদের গাড়ী এসে দাঁড়াল। সামনেই পুলিশ চৌকি। আমাদের বাস ড্রাইভার পুলিশকে টুরিস্ট পার্টি জানাতেই ওরা বাসকে ছেড়ে দিল। দেখলাম রাস্তার পাশে লেখা ওয়েলকাম টু মেঘালয়। বাসপ আমার পাশের সিটে অমিতাভ মুখোপাধ্যায় ও ওর স্ত্রী তৃপ্তি। আমরা একসাথে রাজস্থান টুরেও গিয়েছিলাম। বড় ভালো ফ্যামিলি। অমিতাভ বলে দাদা মেঘালয়ে তাহলে এসে পৌঁছালাম? আমি বললাম হ্যাঁ ভাই। উত্তর পূর্ব ভারতের সেভেন সিস্টার্স হল অসম, অরুণাচল প্রদেশ, মিজোরাম, মেঘালয়, নাগাল্যান্ড, মনিপুর ও ত্রিপুরা। বিভিন্ন ধরনের আাদিবাসীদের বাস এ রাজ্য গুলিতে। খাওয়াদাওয়া কালচার সব ভিন্ন ধরণের। বেশ হাসিখুশী স্বামী স্ত্রী। আমি বললাম মেঘালয়ে কিন্তু খাসি,জয়ন্তীয়া ও গারো সম্প্রদায়ের মানুষ বাস করে।আসলে খাসি পাহাড়, জয়ন্তীয়া পাহাড় ও গারো পাহাড় তিন পাহাড়ের রাজ্য মেঘালয। রাজধানী শিলং। সবচেয়ে অদ্ভুত ব্যাপার এই তিন সম্প্রদায়ের উপজাতি ই মাতৃতান্ত্রিক । পরিবারের প্রধান হলন মা।সম্পত্তির অধিকারী হয় ছোট মেয়ে।গতকাল কাজিরাঙ্গা এক্সপ্রেস ট্রেনে শিলং এর বাসিন্দা মাফিজুর রহমান আমাকে বলেছিলেন এখানকার সমাজ মাতৃতান্ত্রিক।। বিয়ের পর ছেলেদের তাদের শ্বশুর বাড়ি গিয়ে থাকতে হয়।স্ত্রীর উপাধি নিতে হয়।এমন কি তার উপার্জনের অর্থ ও শ্বশুর বাড়ীতে দিতেে হয়। খাসিরা বেশীরভাগই খ্রীস্টান। জয়ন্তীয়া ও গারো উপজাতির মানুষ জনের মধ্যে অনেক৷ হিন্দু আছে। এরা প্রকৃতির উপাসক। এদের অনেকের উপাস্য দেবতা মোরগ।
এক জায়গায় বাস এসে দাঁড়াল। দেখলাম আাশেপাশে অনেকগুলো দোকান। কিন্তু সবগুলো দোকানই মেয়েরা চালাচ্ছে।
শিলং ঢোকার আগে এক জায়গায় আমরা চা খেলাম। এক মহিলা দোকানদার বেশ
কড়া করে চা বানিয়ে দিল। রাত সাড়ে তিনটেয় গুয়াহাটি স্টেশনে ট্রেন থেকে নেমে শরীরটা ভীষণ অবসন্ন হয়ে আছে। এরপর এতক্ষণ বা জার্নি। চা খেয়ে শরীর বেশ ঝরঝরে। আবার বাস ছাড়ল। কিছুক্ষণ পাহাড়ী পথ ধরে চলতে চলতে আমরা এসে পৌঁছালাম এক মনোরম লেকের ধারে বিশাল এক লেক।লেকের নাম উমিয়াম লেক।মেঘালয়ের খাসি জয়ন্তী পাহাড় থেকে উৎপত্তি হয়ে কপিলি নদীর শাখা উমিয়াম নদীর জলে বাঁধ দিয়ে তৈরী হয়েছে উমিয়াম জল বিদ্যুত কেন্দ্র। বিশাল লেক।লেকে বোটে চড়ার ব্যবস্থা আছে। চারধারে পাহাড় জঙ্গল দিয়ে ঘেরা নির্জন এই লেকটি মেঘালয়ের অত্যন্ত দর্শনীয় স্থান।
এই লেকে ঢোকার এনট্রি ফি জনপ্রতি পঞ্চাশ টাকা। আমরা কিছুক্ষণ এই লেকটি ঘুরে ঘুরে দেখলাম। আমাদের ভ্রমণসঙ্গী অসিত বটব্যাল ছিলেন সি এম ই আর আই এর সায়ন্টিস্ট। ওনার স্ত্রী ইন্দ্রাণী সদ্য স্কুল শিক্ষকতা থেকে অবসর নিয়েছেন। ভারি মিশুক পরিবার। অসিত বাবুর ফটোগ্রাফীর হাত খুব ভালো। উনি বললেন সদ্য শিক্ষকতা অবসর নিয়ে স্ত্রীর মন খুব খারাপ। স্ত্রীর মন ভালো করতে তিনি এই টুরে এসেছেন। আমি বললাম এত সুন্দর প্রাকৃতিক পরিবেশে ওনার মন নিশ্চয়ই ভালো হবে। মানুষ দুটি খুব ভালো। বাকী সব সহযাত্রীকে ও ভালই মনে হচ্ছে।আমরা লেক দেখে বেরিয়ে লেক থেকে দশ কিলোমিটার দূরে শিলং এর উদ্দেশ্যে রওনা হলাম। যাকে ব্রিটিশরা নাম দিয়েছিল প্রাচ্যের স্কটল্যান্ড। পাহাড় কেটে এত বিশাল এক শহর আমাক মুগ্ধ করল।রাস্তার ট্রাফিক পুলিশ থেকে বিভিন্ন ছোট বড় শপে জিনিসপত্র বিক্রেতা সবাই মহিলা। বাজারের ব্যাগ হাতে চলেছেন আগে আগে মহিলা পেছনে তার স্বামী। শুনলাম ভারতের মধ্যে মহিলাদের জন্য সবচেয়ে নিরাপদ রাজ্য মেঘালয়, নাগাল্যান্ডের মত মাতৃতান্ত্রিক রাজ্য।
শিলং শহরে ঢোকার মুখেই প্রচুর জ্যাম। হোটেলে ঢুকতে ঢুকতে দুপুর বারোটা বেজে গেল। আমাদের ডবল বেডের রূমটা বেশ ভালো। রূমে ঢুকে স্নান সেরে ফ্রেস হয়ে নিলাম। গৌতম কিচেন এর লোকজন নিয়ে যায়।সঙ্গে রান্নার সরঞ্জাম ও বরফের বাক্সে মাছ।
আমাদের পৌঁছাতে দেরী হওয়াতেও রান্না হতে৷ কিন্তু খুব একটা দেরী হলনা। ২টার মধ্যে
আমাদের গরম গরম ভাত, ডাল, আলু পোস্ত, ও পাবদা মাছের ঝোল।
দুপুরে একটু রেস্ট নিয়ে আমরা হাঁটতে হাঁটতে ওয়ার্ডস লেক সিরকা গেলাম। পার্কে ঢোকার এনট্রি ফি কুড়ি টাকা। কিন্ত সিনিয়র সিটিজেন হলে আধার কার্ড দেখিয়ে দশ টাকা লাগে। পার্কের ভেতরে ঢুকলেই মন ভালো হয়ে যায়। কি সুন্দর একটি পার্ক। ভেতরে একটি লেক। ঝির ঝির করে বৃষ্টি পড়ছিল।ছাতা মাথায় পার্কে ঘোরার আনন্দই আলাদা।
এই পার্কের ইতিহাস হল
১৮৮৫ থেকে ১৮৮৭ সাল পর্যন্ত অসমের চীফ অফ কমিশনার পদে আসীন ছিলেন স্যার
উইলিয়ম ওয়ার্ড। তার স্মরণে ১৮৮৪ সালে শিলং এ ওয়ার্ডস লেক সিরকা নামে এই মনোরম লেকটি তৈরী হয়। দুপাশে ঘন রেন ফরেস্টের মাঝে এই মনোরম লেকটি দেখে মনটি ভরে যায়। মেঘালয়ের রাজধানী শিলং এর বিখ্যাত পার্ক এটি। ঝিরঝিরে বৃষ্টির মধ্যে খাসি ও নাগা ছাত্ররা একটা শেডের মধ্যে গাইছিল।বৃষ্টিভেজা অপরাহ্নে এ অনুষ্ঠানে সাক্ষী থাকার স্মৃতি ভুলব না কখন ও।
এখানে সন্ধ্যা হয় তাড়তাড়ি। আমরা হোটেলে ফিরে এলাম। সন্ধ্যা বেলায় গৌতমের ছেলেরা মুড়ি, চপ ও চা দিয়ে গেল। রতে ডিনারে রুটি ছোট চিংড়ি ও পটলের তরকারি, ডাল খেলাম। অসম্ভব ক্লান্ত সবাই। রাতে একটু ঠান্ডা লাগছিল। আজ এই পর্যন্ত।
pynursla
দিয়ে
ঢোকার এনট্রি ফি জন প্রতি পঞ্চাশ টাকা।
শিলং থেকে ৯০ কিলোমিটার দূরে মাওলাওং গ্রাম তকমা পেয়েছে এশিয়ার সবচেয়ে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন গ্রাম হিসেবে। গাছের উপর তৈরি বাড়ি অ
চেরাপুঞ্জি বিখ্যাত বৃষ্টির জন্য শুধু বৃষ্টি নয় বৃষ্টিপাতের আশীর্বাদ স্বরূপ এখানে রয়েছে চোখ জুড়ানো ঝরনা উর রহস্যময় গুহা। চেরাপুঞ্জির জনপ্রিয় স্থানগুলোর মধ্যে রয়েছে বলছি মাই গুহা ও ওপাহাড়ের সারি।



