১৪৩৩ বাংলা নববর্ষ উদযাপন
আমার কথা, ১৬ এপ্রিল
প্রণয় রায়, দুর্গাপুর:


সৌর পঞ্জিকা অনুসারে বাংলা মাস অনেক কাল আগে থেকেই পালিত হতো। সৌর বছরের প্রথম দিন আসাম বাংলা কেরল,মনিপুর, নেপাল, উড়িষ্যা, পাঞ্জাব, তামিলনাড়ু, ত্রিপুরার সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হিসেবে অনেক আগে থেকেই বাংলা নববর্ষ পালিত হতো। তখন নববর্ষ ঋতু ধর্মী উৎসব হিসাবে পালিত হতো। এর মূল তাৎপর্য ছিল কৃষি কাজ। একসময় চাষবাসের জন্য কৃষকদের ঋতুর উপরই নির্ভর করতে হতো।
ভারততত্ত্ববিদ জেমস প্রিন্সেপ এবং ঐতিহাসিক নীতীশ সেনগুপ্তের গবেষণায় শশাঙ্ককেই বঙ্গাব্দের প্রবর্তক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
আজ থেকে ১৪০০ বছর আগে গুপ্ত বংশের শেষ সম্রাট মহাসেনগুপ্ত কে পরাজিত করে গৌড় বংশের রাজা শশাঙ্ক ৭ম শতাব্দীতে বাংলা শাসন শুরু করার সাথে সাথে বাংলা বর্ষপঞ্জি বা বঙ্গাব্দ চালু করেন। বঙ্গ থেকে ভুবনেশ্বর হয়ে পূর্বদিকে কামরূপ পর্যন্ত বিস্তৃত ছিলো শশাঙ্কের রাজ্য।৫৯৪ খ্রিষ্টাব্দ থেকে যখন বাংলাদেশে মুসলমানদের আগমন ঘটেনি তখন থেকেই বঙ্গাব্দের সুচনা ও বাংলা ক্যালেন্ডার চালু হয়।বহু শতাব্দী পুরোনো দুটি শিব মন্দিরে পাওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করে বঙ্গাব্দ বা বাংলা সন সম্রাট আকবরের শত শত বছর আগে থেকেই ছিল।
আবার অনেক ঐতিহাসিকের মতে
ভারতবর্ষে মুঘল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার পর সম্রাটরা হিজরি পঞ্জিকা অনুসারে কৃষি পণ্যের খাজনা আদায় করতো। কিন্তু হিজরি সন চাঁদের উপর নির্ভরশীল হওয়ায় তা কৃষি ফলনের সাথে মিলতো না। এতে অসময়ে কৃষকদের সম্রাট কে খাজনা পরিশোধ করতে হতো। খাজনা আদায়ের সুষ্ঠু ব্যবস্থা প্রণয়ন করতে মুঘল সম্রাট আকবর বাংলা সনের প্রবর্তন করেন। তিনি মূলত প্রাচীন বর্ষপঞ্জিতে সংস্কার আনার পরিকল্পনা নেন। সম্রাট আকবরের এই পরিকল্পনাকে রুপায়ন করতে বাংলার বিখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানী ফতেহউল্লাহ সিরাজি সৌর সন ও আরবি হিজরি সনের উপর ভিত্তি করে নতুন বাংলা সন প্রবর্তন করেন। ১৮৫৪ খ্রিস্টাব্দের ১০ মার্চ বা ১১ মার্চ থেকে বাংলা সন গণনা শুরু হয়। তবে এই গণনা পদ্ধতি কার্যকর করা হয় আকবরের সিংহাসন আরোহনের ৫ নভেম্বর ১৯৫৬ থেকে । প্রথমে এই সনের নাম ছিল ফসলি সন। পরে বঙ্গাব্দ বা বাংলা সন নামে পরিচিত হয়।
আজ থেকে ৪৫০ বছর আগে মোগলরা বাংলা শাসন করে।অথচ , বাংলাদেশের সভ্যতার ইতিহাস প্রায় পাঁচ হাজার বছরের পুরনো ।
তাই, প্রাচীন বাংলার উৎসবের সূচনা হিসেবে রাজা শশাঙ্ককেই আদি প্রবর্তক বলে মনে করা হয়
আধুনিক নববর্ষ উদযাপন শুরু হয় ১৯১৭ সাল থেকে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ব্রিটিশদের বিজয় কামনা করে সে বছর পহেলা বৈশাখ হোম যজ্ঞ কীর্তন ও পুজোর মাধ্যমে পহেলা বৈশাখ পালন করা শুরু হয়।
রবীন্দ্রনাথের ৪৩ বছর বয়সে ১৯০৩ সালে শান্তিনিকেতনে প্রথম বাংলা নববর্ষ পালন করা শুরু হয় ।
১৯৩৬ সালের ১৩৪২ সন পয়লা বৈশাখ শান্তিনিকেতনে প্রথম রবীন্দ্রনাথের জন্মদিন পালন করা হয়। শান্তিনিকেতনে ১৯০১ সালে প্রথম ব্রহ্মচর্য বিদ্যালয় তারপর পাঠভবন এরপর বিশ্বভারতী এবং শ্রীনিকেতন শুরু করেন।এ সময় এই অঞ্চলটাতে বড় গাছ বা বনের সংখ্যা ছিল খুব কম। ছিল প্রচন্ড জলের কষ্ট। চৈত্র মাস থেকে শুরু হতো চৈত্র মাস থেকে শুরু হত অসহনীয় অবস্থা। এই সময় এখানকার আশ্রমিকদের পালাই পালাই অবস্থা হতো। রবীন্দ্রনাথ কিছু আশ্রমিকদের অনুরোধে পহেলা বৈশাখ তার জন্মদিন পালনের অনুমতি দেন। এরপর থেকে বরাবর বিশ্বভারতী পহেলা বৈশাখ কবি প্রণাম অনুষ্ঠান করে এসেছে। ১৯৪১ এ কবির মহাপ্রয়াণ এর আগের বছরও পহেলা বৈশাখ রবীন্দ্রনাথের জন্মদিন শান্তিনিকেতনে পালন করা হয় । রবীন্দ্রনাথের মহাপ্রয়নের পরও দীর্ঘদিন পহেলা বৈশাখ শান্তিনিকেতনে রবীন্দ্রজয়ন্তী পালন করা হয়।
এদিন সাতসকালে ফুলঝোর শরত পল্লীতে স্বপ্ন ছন্দম বাংলা নববর্ষ উদযাপন করল প্রভাতফেরীর মধ্যে দিয়ে। সংস্থার কর্ণধার কাকলী দাসগুপ্ত চক্রবর্তী জানালেন ভোরের মিষ্টি আলো গায়ে মেখে প্রভাতফেরীর মধ্যে দিয়ে তার প্রতি বছর বাংলার সংস্কৃতিকে তুলে এভাবে বাংলা নতুন বছরকে বরণ করেন।
এদিন সকালে ৭ সেন্ট্রাল এভিনিউতে নিখিল ভারত বঙ্গ সাহিত্য সম্মেলন এর দুর্গাপুর শাখা বাংলা বর্ষবরণ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। সংস্থার
সচিব রীতা সাহা মুখবন্ধ রাখলেন।।
কবি কৌশিক চট্টোপাধ্যায়ের কবিতা পাঠের পর
অনুষ্ঠান জমিয়ে দিলেন সমীর দাস ও অতনু রায় মাইকেল মধুসূদনের রেখো মা দাসেরে মনে কবিতাকে কেন্দ্র করে কাকা ভাইপোর এক অসাধারণ হাস্যরসের উপস্থাপনা করে।
সুকান্ত দেবনাথ বাঁশি বাজাল। ওর মনকাড়া বাঁশির সুরে বছরের প্রথম দিন সকালে মনটা একটা ভাললাগা আবেশে ভরে গেল।
বিপ্লব চট্টোপাধ্যায় গাইলেন অতুল প্রসাদের তুমি নির্মল কর মঙ্গল করে মলিন মর্ম মুছায়ে গানটা।প্রভাতের সূর্য একটু মাথার উপরে উদয় হয়ে যেন খুশীর রেশ ছড়িয়ে দিয়ে জানাল যা আছে গত বছরের মালিন্য সব এবার ঘুচে যাবে।
ইজাজুল হক বললেন একটা কবিতা।তারায় ভরা আকশের মিটিমিটি হাসি। প্রকৃতিকে ভালবেসে ভালবাসার কবিতা।
অলিম্পিয়া তার কচি কন্ঠে গাইলো আধখানা চাঁদ হাসিছে আকাশে,আধখানা চাঁদ নীচে।
প্রীতিকনা দেবনাথ নতুনেরে খুঁজি বারবার এই বৈশাখের ভোরে কবিতাটি আবৃত্তি করল তার সুললিত কন্ঠস্বরে।
কাজলি দাসগুপ্ত চক্রবর্তী জয় গোস্বামীর কবিতা পাঠ করল।
সুস্মিতা ঘটক গাইল রাগাশ্রয়ী গান। সবসময়ই মুগ্ধ হই এবারও মুগ্ধ হলাম কাকলি দাশগুপ্ত চক্রবর্তী কবিতা পাঠে।
ভালো লাগলো মোহিত গাঙ্গুলীর স্মৃতিকথন। এরপর অনুষ্ঠান চলতে থাকলো নিজস্ব গতিতে ।
একটা মনোগ্রাহী স্নিগ্ধ ঘরোয়া অনুষ্ঠান। দুর্গাপুরের অনেক নামি শিল্পীরাই এই সংস্থার সঙ্গে জড়িত। অনুষ্ঠান সঞ্চালক বিপ্লব চট্টোপাধ্যায় যাকে যখন আমন্ত্রণ জানাই তিনি এসে অনুষ্ঠানটি করলেন এবং সবার সাধুবাদ উড়িয়ে আবার নিজের জায়গায় গিয়ে বসলেন। কারো মুখে কোন কথা নেই, কোন গল্প করা বা সেলফি তোলার ব্যস্ততাও নেই। সবাই যেন তারিয়ে তারিয়ে অনুষ্ঠানটা উপভোগ করতে ব্যস্ত এদিন অবাক করলেন সংগীতশিল্পী বিপ্লব চট্টোপাধ্যায়। আমি ওনার পুরাতনী গানের ভক্ত। কিন্তু উনি এত সুন্দর ভাবে অনুষ্ঠানকে তার অসাধারণ সঞ্চালনায় সবাইকে যেভাবে একটা সুতোয় বেঁধে মুগ্ধ করে রাখলেন তা কোন অংশেই পেশাদার দক্ষ অনুষ্ঠান সঞ্চালকদের চেয়ে কোন অংশেই কম নয়।
এলাম বলাকা মণিমেলায়। প্রভাত ফেরীর পর বলাকার মাঠে শিশুরা কচি কন্ঠে সুন্দর আবৃত্তি গান পরিবেশন করলো।




