অভিমন্যুর লক্ষ্যভেদের স্বপ্ন হল না পূরণ
আমার কথা, ৯ এপ্রিল
প্রণয় রায়, দুর্গাপুর:
সংবাদদাতা প্রণয় রায়
দুজনেরই বয়স ১৫ বছর। দুজনেই খেলাধুলার সঙ্গে জড়িত।একজন অভিজাত ক্রিকেট খেলায় নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে। আর আরেকজন এমন একটি কষ্টসাধ্য খেলা যেখানে অনেক ঘাম ঝরাতে হয়, পরিশ্রম ও অধ্যবসায় সবকিছুই আছে। কিন্তু ক্রিকেটের মত এ খেলায় এখনও তেমন কদর নেই। অনেকে হয়তো জানেনই না শক্তি উত্তোলন বা পাওয়ার লিফটিং বলে একটি প্রচন্ড পরিশ্রমসাধ্য খেলা আছে।
এ যেন খেলাধুলার দুনিয়ায় এক দুয়োরানি ক্রীড়া।ক্রিকেটে ১৫ বছরের বৈভব ঝলমল করছে গোটা ক্রিকেট দুনিয়ায়। তার কত নাম কত অর্থ কত সম্মান। আর বোকারোর পাওয়ার লিফটার ১৫ বছর বয়সী অভিমুন্য চ্যাটার্জী যার ডাক নাম কৃষ্ণ সেই ছেলেটি এরই মধ্যে পাওয়ার লিফটিং দুনিয়ায় একটার পর একটা খেতাব জিতে এগিয়ে চলছিল সামনের দিকে। কিন্তু এ খেলার তেমন প্রচার নেই। তাই ও এতদিন পর্দার আড়ালেই ছিল। হয়তো আরো বড় হলে ওর নাম চারধারে ছড়ালে তখন হয়তো ওকে অনেকে চিনতো।
ওর বাবা দেবীপ্রসাদ চ্যাটার্জি ও মা সুচেতা চ্যাটার্জি পাওয়ার লিফটিং জগতে অত্যন্ত সুপরিচিত নাম। দুজনেই দক্ষ ও প্রতিষ্ঠিত পাওয়ার লিফটার। দুজনেই জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্তরে পাওয়ার লিফটিং এ সাফল্যের স্বাক্ষর রেখেছেন। ভারতীয় ডাক বিভাগের বোকারো শাখার কর্মী দেবীপ্রসাদ পাওয়ার লিফটিং ইন্ডিয়ার পূর্বাঞ্চলের সম্পাদক। তার হাত দিয়ে প্রচুর ভালো ভালো পাওয়ার লিফটার বেরিয়েছে। আজ তারা প্রতিষ্ঠিত পাওয়ার লিফটার।আসলে এই খেলাটা খুব কঠিন খেলা। বুকের উপর ওজন তোলা।,ওজন নিয়ে উঠবস করা ও ভারী ওজন কোমরের উপর তোলা। খুব অল্প বয়স থেকেই অভিমুন্য তার বাবা ও মাকে অনুসরণ করে একজন পাওয়ার লিফটার তৈরি হচ্ছিল। নিজের ছেলেকে দেবীপ্রসাদ ও সুচেতা সে পথেই এগিয়ে নিয়ে চলেছিলেন। কঠোর অনুশীলন ও পরিশ্রম ও অধ্যবসায়ের মধ্যে অভিমুন্য তার শিশুকাল থেকেই এই খেলাটির প্রতি অনুরক্ত হয়েছিল। একদিন এই শক্তি উত্তোলন প্রতিযোগিতায় ও বিশ্বজয়ী হবে এই স্বপ্ন ও দেখতো। ওর মাকে বলতো দেখো একদিন আমি এই পরিশ্রমসাধ্য পাওয়ার লিফটিং প্রতিযোগিতায় দেশের মুখ উজ্জ্বল করব। তার বাবা মায়ের কঠোর অনুশাসন, প্রশিক্ষণ অধ্যবসায়ে ও ধীরে ধীরে নিজেকে গড়ে তুলছিল।পড়াশুনায়তেও অত্যন্ত মেধাবী ছিল অভিমন্যু। এবারও ঝাড়খন্ড বোর্ডে মাধ্যমিক পরীক্ষা দিয়েছে। অত্যন্ত ভালো গিটার বাজাতো। ও বলতো আমি আমার প্রচন্ড পরিশ্রম নিষ্ঠা দিয়ে একদিন বাবা মায়ের মুখ উজ্জ্বল করব। আমাকে বড় পাওয়ার লিফটার হতেই হবে। এই কিশোর ছেলেটি ইতিমধ্যেই জেলা, রাজ্য পেরিয়ে প্রতিটি স্তরের পাওয়ার লিফটিং বা শক্তি উত্তোলন প্রতিযোগিতায় উজ্জ্বল স্বাক্ষর রেখে চলছিল।
ও স্বপ্ন দেখতো আন্তর্জাতিক পাওয়ার লিফটিং প্রতিযোগিতায় বিজয়ী ওর বাবা দেবীপ্রসাদ ও জাতীয় পাওয়ার লিফটিং প্রতিযোগিতায় বিজয়িনী ওর মা সুচেতার মত ভবিষ্যতে একজন সফল পাওয়ার লিফটার হয়ে মহাভারতের অর্জুনের মত অভিমুন্যও সবকিছু সাফল্যের সঙ্গে লক্ষ্যভেদ করবে। হয়তো করতো ও। ওর বাবার চাকরির সুবাদে ওরা বোকারোতেই থাকতো। গত ২৯ মার্চ বোকারোতে উচ্চ পরিবাহী বিদ্যুতের তারে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে অভিমুন্য গুরুতর জখম হয়। প্রথমে বোকারো হাসপাতাল এরপর ৩১ শে মার্চ তাকে আনা হয় দুর্গাপুরের এক বেসরকারি হাসপাতালে। চলে যমে মানুষের টানাটানি । শরীরের বেশিরভাগ অংশই বিদ্যুৎপৃষ্ট হয়ে জ্বলে যাওয়ায় চিকিৎসকদের শত চেষ্টায়ও তাকে বাঁচানো যায়নি। মৃত্যুর দুদিন আগে পর্যন্ত হাসপাতালের বার্নিং ইউনিটে ওর বেডে শুয়ে শুয়ে ওর মাকে বলেছে মা দেখবে আমি ভালো হয়ে যাব। এবার কিন্তু আমি পড়াশোনার সঙ্গে সঙ্গে পাওয়ার লিফটিং এ আরো জোর দেব। তোমাদের মত আমি ও একজন বিখ্যাত পাওয়ার লিফটার হবো। আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন দুর্গাপুরের পাওয়ার লিফটার সীমা দত্ত চ্যাটার্জি, ওয়েস্ট বেঙ্গল স্টেট পাওয়ার লিফটিং অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক কানাইলাল দে সহ এই অ্যাসোসিয়েশনের সর্বভারতীয় কর্মকর্তারাও অভিমুন্য কে সুস্থ করে তুলতে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন। কারণ দেবীপ্রসাদ চ্যাটার্জী একজন শুধু স্বনামধন্য পাওয়ার লিফটার নন তিনি পাওয়ার লিফটিং ইন্ডিয়ার পূর্বাঞ্চলের সম্পাদক।
সীমা দত্ত চ্যাটার্জি অশ্রুসিক্ত চোখে জানান অভিমুন্য কে বাঁচানোর জন্য তাদের অক্লান্ত প্রয়াস কোন কাজে লাগলো না। তার বাবা ও মাকে কি বলে সান্তনা দেবে তার কোন উত্তর তারা খুঁজে পাচ্ছে না। সীমা আরও জানালেন এত শারীরিক যন্ত্রণার মধ্যেও হাসপাতাল বেডে মৃত্যুর আগের দিন রাতে অভিমুন্যর শেষ কথাটা সীমা দি আমার মাকে একটু ডেকে দেবে, আমি মাকে বলবো ভালো হলেই আবার আমি প্র্যাকটিস শুরু করব।
না তার এই শেষ কথাটি অভিমুন্য মাকে আর বলা হয়নি সীমার। পর দিন সকালেই এই প্রতিভাবান ছেলেটি সকলের মায়া কাটিয়ে অনন্ত লোকে যাত্রা করে। দুর্গাপুর মহাকুমা হাসপাতালের মর্গে অভিমুন্য দেহ কাটা ছেঁড়া করার পর তার পৈতৃক বাড়ি ঝাড়খণ্ডের কাতরাসে যাত্রা করে। তার আগে পশ্চিম বর্ধমান ফিজিক্যাল কালচার অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে অভিমুন্যকে শেষ শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করেন অ্যাসোসিয়েশনের সম্পাদক সুব্রত রায় সহ দুর্গাপুরের প্রচুর ক্রীড়াপ্রেমী মানুষ। অভিমুন্যর মত এই কিশোর প্রতিভাবান পাওয়ার লিফটার এর অকাল মৃত্যু ক্রীড়া জগতের কেউই মেনে নিতে পারছেন না।




