গুটি বসন্তের ভয় থেকে মুক্তির আশায় মা চিন্তামণির পুজো
আমার কথা, ৩ এপ্রিল
সনাতন গরাই, কাঁকসা:
বসন্ত এলেই রাঢ়বঙ্গের প্রকৃতি যেন এক অন্য রূপে সেজে ওঠে। শাল, পিয়াল, পলাশ আর শিমুলের রঙে রাঙা হয়ে ওঠে চারদিক, মাটির গন্ধে ভরে ওঠে বাতাস, আর সেই প্রকৃতির মাঝেই ধীরে ধীরে জেগে ওঠে এক প্রাচীন লোকবিশ্বাস ও আধ্যাত্মিকতার আবহ। এই সময়টাতেই জয়দেবের টিকরবেতা গ্রামের অধিষ্ঠাত্রী দেবী মা চিন্তামণির মাহাত্ম্য বিশেষভাবে অনুভূত হয়। জনশ্রুতি রয়েছে, বসন্ত ঋতু এবং গ্রীষ্ম জুড়ে তিনি রাঢ়বঙ্গের বিভিন্ন গ্রাম পরিক্রমা করেন, আর তাঁর এই অদৃশ্য উপস্থিতিই গ্রামবাসীদের জীবনে বয়ে আনে সুরক্ষা, শান্তি ও আশীর্বাদ। গ্রামবাংলার মানুষের বিশ্বাসের ভিত বড় গভীর। তারা মনে করেন, মা চিন্তামণির পুজো দিলে বসন্ত রোগ, অর্থাৎ গুটি বসন্তের মতো ভয়াবহ রোগ থেকেও রক্ষা পাওয়া যায়। একসময় এই রোগ গ্রামবাংলায় ভীষণ আতঙ্কের কারণ ছিল, তাই দেবীর আরাধনা হয়ে ওঠে মানুষের মানসিক ভরসা ও আশ্রয়স্থল। শুধু রোগব্যাধি নয়, সংসারের অশান্তি, অশুভ শক্তি ও অদৃশ্য বিপদের হাত থেকেও মুক্তি দেন মা এমনটাই বিশ্বাস ভক্তদের। এই পুজোর অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো কালো সরষের ব্যবহার। পুজোর সময় ভক্তিভরে মা চিন্তামণির উদ্দেশ্যে কালো সরষে নিবেদন করা হয়। তারপর সেই সরষে ঘরের এক কোণে কাপড়ে বেঁধে রাখা হয়। লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, এই সরষে অশুভ শক্তিকে প্রতিহত করে এবং পরিবারের ওপর কোনো অকল্যাণ নেমে আসতে দেয় না। এই ছোট্ট আচারটির মধ্যেই লুকিয়ে রয়েছে গ্রামবাংলার প্রাচীন তন্ত্র-লোকাচার ও বিশ্বাসের এক গভীর ছাপ। এই ঐতিহ্যবাহী রীতি মেনেই পশ্চিম বর্ধমানের কাঁকসা ব্লকের গোপালপুর গ্রামেও শুরু হয়েছে মা চিন্তামণির পুজো। পুজোর দিন ভোর হতেই উৎসবের আবহে মেতে ওঠে এলাকার মানুষ। সূর্যের প্রথম আলো ফুটতেই শুরু হয় মন্ত্রোচ্চারণ, শঙ্খধ্বনি ও ধূপের সুগন্ধে ভরে ওঠে পরিবেশ। গ্রামের নারী-পুরুষ, শিশু-বৃদ্ধ সবাই নতুন পোশাকে, ভক্তিভরে মায়ের পুজোয় অংশ নিতে সমবেত হন।পুজোপাঠ চলে নিষ্ঠা ও আচার মেনে। দুপুর গড়াতেই শুরু হয় নরনারায়ণ সেবা। এটি শুধু একটি ভোজন অনুষ্ঠান নয়, এটি মানবতার এক মহান দৃষ্টান্ত। এখানে জাত-পাত, ধনী-গরিবের কোনো ভেদাভেদ থাকে না। সকলেই একই সারিতে বসে প্রসাদ গ্রহণ করেন। গ্রামের মানুষ নিজেরাই রান্নার আয়োজন করেন—ভাত, ডাল, সবজি, কখনও খিচুড়ি বা পায়েস সবকিছুতেই থাকে আন্তরিকতা আর ভালোবাসার স্বাদ। এই সম্মিলিত ভোজন যেন গ্রামবাসীর ঐক্য ও সম্প্রীতির প্রতীক হয়ে ওঠে।সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গে পুজোমণ্ডপে শুরু হয় আরেক নতুন অধ্যায়। আলোয় সেজে ওঠে চারদিক, আর শুরু হয় ভক্তিমূলক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। কীর্তন, ভজন, শ্যামাসঙ্গীত, কখনও বা স্থানীয় শিল্পীদের পরিবেশনায় নাটক বা নৃত্য সব মিলিয়ে জমে ওঠে এক আনন্দঘন পরিবেশ। মায়ের কৃপায় দূর হবে সব অশুভ, ভরে উঠবে জীবন শান্তি, সুস্থতা আর সমৃদ্ধিতে। আর সেই বিশ্বাসকেই বুকে ধারণ করে প্রতি বছর নতুন করে প্রাণ ফিরে পায় এই পবিত্র উৎসব।




