নেই কোন বই, নেই ব্ল্যাকবোর্ড খোলা মাঠের নিচে প্রত্যন্ত গৃহবধূদের নিয়ে অন্য পাঠশালায় রাজ্য পুলিশ
আমার কথা, ১২ আগস্ট
সনাতন গরাই, কাঁকসা:
ত্রিপলের উপর সারি দিয়ে বসে মহিলারা। কেউ গৃহবধূ, কেউ দিনমজুর। কেউ আবার ছেলে-মেয়েদের সঙ্গে নিয়ে এসেছেন টিউশনে। তবে এ কোনও সাধারণ টিউশন নয়। এখানে খাতা-কলম নিয়ে অঙ্ক, বাংলা কিংবা ইংরেজি পড়ানো হয় না। এখানে পড়ানো হয় জীবনযাপনের পাঠ, অধিকার জানার পাঠ, বিপদ থেকে নিজেকে এবং পরিবারকে সুরক্ষিত রাখার পাঠ। আর সেই পাঠের শিক্ষক রাজ্য পুলিশের আধিকারিকরা।কাঁকসার জঙ্গলমহলের প্রত্যন্ত গ্রামের এই ছবিই এদিন নজর কাড়ল। কাঁকসার বিদবিহার গ্রাম পঞ্চায়েতের প্রত্যন্ত গ্রাম বিনোদনপুর, শশীপুর ও ইটাডাঙা এলাকায় মলানদিঘী পুলিশ ফাঁড়ির উদ্যোগে বসেছিল এমনই এক সচেতনতার পাঠশালা। গ্রামের মহিলা থেকে শুরু করে অন্যান্য বাসিন্দা সকলকেই হাজির হয়েছিল এই পাঠশালায়। পুলিশের আধিকারিকরা একেবারে ক্লাস নেওয়ার ভঙ্গিতে গ্রামবাসীদের সঙ্গে কথা বলেন। আর মন দিয়ে সেই পাঠ শুনলেন গ্রামের মহিলারা। মলানদিঘী পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ রাজেশ ভট্টাচার্যের উদ্যোগে এই সচেতনতা শিবিরের আয়োজন করা হয়। উপস্থিত ছিলেন মলানদিঘী ফাঁড়ির পুলিশ আধিকারিক তাপস চক্রবর্তী, মহিলা পুলিশকর্মী এবং এলাকার ভিলেজ পুলিশকর্মীরা। প্রত্যন্ত গ্রামের মানুষের কাছে পৌঁছে গিয়ে তাঁদের দৈনন্দিন জীবনের নানা সমস্যা, সামাজিক সচেতনতা এবং বর্তমান সময়ের বিভিন্ন বিপদ সম্পর্কে সতর্ক করাই ছিল এই শিবিরের মূল উদ্দেশ্য।শিবিরে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয় বাল্যবিবাহ রোধের বিষয়ে। ১৮ বছরের আগে কোনও মেয়ের বিয়ে না দেওয়ার জন্য অভিভাবকদের সচেতন করা হয়। শুধু আইন রয়েছে বলেই নয়, মেয়েদের পড়াশোনা চালিয়ে নিয়ে গিয়ে স্বাবলম্বী করে তোলার উপরও জোর দেন পুলিশ আধিকারিকরা। সরকারি বিভিন্ন প্রকল্পের সুযোগ নিয়ে মেয়েদের উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করার বার্তাও দেওয়া হয়। পাশাপাশি মহিলাদের উপর নির্যাতন, পারিবারিক হিংসা এবং কোনও ধরনের হয়রানির ঘটনা ঘটলে কীভাবে পুলিশের সাহায্য নিতে হবে, সে বিষয়েও গ্রামের মহিলাদের বোঝানো হয়। অনেক সময় প্রত্যন্ত এলাকার মহিলারা সমস্যার কথা প্রকাশ্যে বলতে পারেন না। তাই পুলিশের পক্ষ থেকে তাঁদের আশ্বস্ত করা হয়, কোনও সমস্যা হলে নির্দ্বিধায় পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করার জন্য। তবে বর্তমান সময়ে গ্রামের মানুষের জন্য সবচেয়ে বড় আশঙ্কাগুলির একটি যে সাইবার প্রতারণা, সেই বিষয়েও চলে বিস্তারিত আলোচনা। সরকারি প্রকল্পের নাম করে প্রতারণা, অচেনা নম্বর থেকে ফোন, ওটিপি চাওয়া কিংবা ব্যক্তিগত তথ্য হাতিয়ে নেওয়ার মতো ঘটনা থেকে কীভাবে সতর্ক থাকতে হবে, তা সহজ ভাষায় বোঝান পুলিশ আধিকারিকরা। শিবিরে বক্তব্য রাখতে গিয়ে মলানদিঘী ফাঁড়ির পুলিশ আধিকারিক তাপস চক্রবর্তী বলেন, “আপনারা কেউ অচেনা নম্বর থেকে ফোন এলে ধরবেন না। অচেনা লোক এলাকায় এসে যদি আপনাদের নাম-পরিচয় জিজ্ঞাসা করে, তাঁকে কোনও তথ্য দেবেন না। বিশেষ করে অন্নপূর্ণা যোজনা সহ রাজ্য সরকারের বিভিন্ন প্রকল্পের নাম করে অচেনা নম্বর থেকে ফোন এলে সতর্ক থাকবেন। কেউ যদি ফোন করে ওটিপি চায়, কোনওভাবেই ওটিপি দেবেন না। ১৮ বছরের নিচে কোনও মেয়ের বিয়ে দেবেন না। সরকার মেয়েদের জন্য নানান প্রকল্প এনেছে। সেই প্রকল্পগুলির সুযোগ নিয়ে মেয়েদের উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করুন। মেয়েরা পড়াশোনা করে নিজের পায়ে দাঁড়াক এটাই আমাদের সকলের লক্ষ্য হওয়া উচিত।”



