গোপালপুর রুপতাপস ক্লাবের সফল পর্বত অভিযান
আমার কথা, ১৩ সেপ্টেম্বর
সংবাদদাতা, আসানসোল:
পর্বতারোহণ, প্রকৃতিপ্রেম, শৃঙ্খলা, সাহসিকতা এবং দেশপ্রেমের মানসিকতা গড়ে তোলার লক্ষ্যকে সামনে রেখে আসানসোলের গোপালপুর রুপতাপস অ্যাডভেঞ্চার ক্লাব এ বছরও আয়োজন করেছিল হিমালয়ে পর্বত অভিযান। ২৯ আগস্ট আসানসোল থেকে রওনা দিয়েছিল গোপালপুর রুপতাপস এর টিম, মাউন্ট জগৎসুখ, যার উচ্চতা ৫,০৫০ মিটার। ও মাউন্ট দেওটিব্বা ৬,০০১ মিটার
এই অভিযানের টিম লিডার কৌশিক চট্টরাজ। তাঁর নেতৃত্বে অভিযাত্রী দলের সদস্যরা হলেন অর্পিতা ব্যানার্জি, সুজয় মণ্ডল, সৌম্যদীপ রুদ্র, তুহিনা সিং সর্দার, কাঞ্চন চট্টরাজ , শ্রুতি পাল, সংযুক্তা মণ্ডল, পৃথিস মণ্ডল, সৌভিক চক্রবর্তী, পার্থ গড়াই, রজত মহলানবীর, অর্পণ সেন, শত্রুঘন শাহ এবং শ্যামসুন্দর পাল। দুর্গম পাহাড়ি পথ, প্রতিকূল আবহাওয়া, তীব্র ঠান্ডা এবং উচ্চতার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার মতো বিভিন্ন চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়েই তাঁদের এগিয়ে যায় ।
মাউন্ট ডিও টিব্বা হিমাচল প্রদেশের একটি উল্লেখযোগ্য উচ্চপর্বত। ৬,০০১ মিটার উচ্চতার এই শৃঙ্গ জয় করার লক্ষ্য নিঃসন্দেহে অভিযাত্রীদের শারীরিক সক্ষমতা, মানসিক দৃঢ়তা, ধৈর্য ও দলগত সমন্বয়ের কঠিন পরীক্ষা নেবে। অন্যদিকে ৫,০৫০ মিটার উচ্চতার মাউন্ট জগতসুখ অভিযানও যথেষ্ট চ্যালেঞ্জিং। এই দুই অভিযানের মধ্য দিয়ে অংশগ্রহণকারীরা শুধু পর্বতের উচ্চতা স্পর্শ করা লক্ষ্য নয়, বরং নিজেদের সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করারও অভিজ্ঞতা অর্জন করে।
গোপালপুর রুপতাপস অ্যাডভেঞ্চার ক্লাবের মতে, পর্বতারোহণ শুধুমাত্র একটি দুঃসাহসিক ক্রীড়া নয়। এর মাধ্যমে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে আত্মনির্ভরতা, শৃঙ্খলা, নেতৃত্বের গুণ, দলগতভাবে কাজ করার মানসিকতা এবং প্রতিকূল পরিস্থিতিতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা তৈরি হয়। পাহাড় মানুষকে প্রকৃতির কাছে নিয়ে যায় এবং প্রকৃতির শক্তি ও সৌন্দর্যকে উপলব্ধি করার সুযোগ করে দেয়। সেই কারণেই ছাত্রছাত্রীদের এই ধরনের অভিযানে অংশগ্রহণের সুযোগ করে দেওয়াকে ক্লাব বিশেষ গুরুত্ব দেয়।
দলনেতা কৌশিক চট্টরাজ যানান আমাদের অভিযান শুরু করি ১ সেপ্টেম্বর ছিক্কা থেকে সেরি, টেষ্টা হয়ে জগৎসব পর্বতের চূড়ায় পৌঁছায় টিমের সকল সদস্য। চলতি মাসের ৪ তারিখ রাত ১১ টার সময় পর্বতের চুড়ায় পৌছানোর উদ্দেশ্যে রওনা দেয় টিম। পর্বতের শিখরে পৌঁছায় সকাল আটটার সময়। সেখানে ভারতের জাতীয় পতাকা এবং ক্লাব পতাকা উত্তোলন করে, পুজো দিয়ে আবার টিম নিজের ক্যাম্পে ফেরত আসে। এরপর লক্ষ্য দ্বিতীয় পর্বত শৃঙ্গ মাউন্ট দেওটিব্বা তার উদ্দেশ্যে টিম যখন রওনা দেয় সেখানে ছিল ৫ জন সদস্য কৌশিক চট্টরাজ, অর্পিতা ব্যানার্জি, সৌমদীপ রুদ্র, অর্পণ সেন এবং সুজয় মণ্ডল, কিন্তু আরোহন করার সময় দোয়াঙ্ঘন কল এর উপর থেকে বড় বড় বোল্ডার আসার কারণে দুটো মেম্বার এনজোড হয়। সেই কারণেই নিচে নামার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এই মুহূর্ত শুধু অভিযাত্রীদের কাছে নয়, তাঁদের পরিবার, বন্ধু, শুভানুধ্যায়ী এবং ক্লাবের সদস্যদের কাছেও অত্যন্ত আবেগ ও গর্বের।
বিশেষ করে ছাত্রছাত্রীদের কাছে এই ধরনের অভিযান জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষামূলক অভিজ্ঞতা হয়ে উঠতে পারে। শ্রেণিকক্ষের বাইরের পৃথিবীকে কাছ থেকে দেখা, প্রকৃতির সঙ্গে সরাসরি পরিচিত হওয়া এবং কঠিন পরিস্থিতিতে নিজের মানসিক শক্তিকে পরীক্ষা করার সুযোগ তাঁদের ভবিষ্যৎ জীবনে আত্মবিশ্বাস বাড়াবে। পাহাড়ের প্রতিটি পদক্ষেপ তাঁদের শেখাবে ধৈর্য, নিয়মানুবর্তিতা এবং লক্ষ্যে পৌঁছনোর জন্য অবিচল থাকার শিক্ষা।এই অভিযানে দলকে যারা সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে তাদেরকে ধন্যবাদ জানান ক্লাব সভাপতি ।
এই অভিযানকে ঘিরে ক্লাবের সদস্য ও অভিযাত্রীদের মধ্যে ইতিমধ্যেই উৎসাহ ও উদ্দীপনা তৈরি হয়েছে। অভিযানের প্রস্তুতিতে শারীরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি, পাহাড়ি পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া, প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম সম্পর্কে ধারণা এবং দলগত সমন্বয়ের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কারণ পর্বতারোহণে ব্যক্তিগত দক্ষতার পাশাপাশি দলের প্রত্যেক সদস্যের পারস্পরিক সহযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
গোপালপুর রুপতাপস অ্যাডভেঞ্চার ক্লাবের এই উদ্যোগ আসানসোল তথা পশ্চিমবঙ্গের অ্যাডভেঞ্চার স্পোর্টসের ক্ষেত্রেও একটি ইতিবাচক বার্তা বহন করে। শহর ও মফস্সলের তরুণ প্রজন্মকে মোবাইল ও ভার্চুয়াল জগতের বাইরে এনে প্রকৃতির সঙ্গে যুক্ত করা এবং শারীরিক ও মানসিক সক্ষমতা বিকাশে উৎসাহিত করা আজকের দিনে বিশেষ প্রয়োজনীয়। সেই দিক থেকে এই অভিযান নিছক একটি পর্বতারোহণ কর্মসূচি নয়, বরং নতুন প্রজন্মের মধ্যে সাহস, শৃঙ্খলা, প্রকৃতিপ্রেম ও আত্মবিশ্বাস তৈরির একটি সামাজিক উদ্যোগ।
২৯ আগস্ট আসানসোল রেলস্টেশন থেকে শুরু হবে তাঁদের যাত্রা। সামনে হিমালয়ের দুর্গম পথ, অজানা অভিজ্ঞতা এবং কঠিন চ্যালেঞ্জ। হাতে থাকবে ক্লাবের পতাকা ও জাতীয় পতাকা, আর মনে থাকবে নতুন কিছু করার প্রত্যয়। এই ১৬ অভিযাত্রীর প্রত্যাশা একটাই—সফলভাবে অভিযান সম্পন্ন করে নিরাপদে ফিরে আসা এবং নিজেদের অভিজ্ঞতার মাধ্যমে আরও অনেক তরুণ-তরুণীকে পর্বতারোহণ ও প্রকৃতির প্রতি আকৃষ্ট করা।
অভিযাত্রী দলের উদ্দেশে শুভেচ্ছা জানিয়ে ক্লাবের পক্ষ থেকে বলা যায়—পাহাড় শুধু জয় করার নয়, পাহাড়কে সম্মান করারও শিক্ষা দেয়। সেই শিক্ষা সঙ্গে নিয়েই গোপালপুর রুপতাপস অ্যাডভেঞ্চার ক্লাবের অভিযাত্রীরা এগিয়ে চলুন হিমালয়ের পথে। তাঁদের এই অভিযান সফল হোক, নিরাপদ হোক এবং আগামী প্রজন্মের কাছে সাহসিকতা, প্রকৃতিপ্রেম ও দেশপ্রেমের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে উঠুক।



