জেলা ঢাকবে সবুজ আবীরে? “আমার কথা”-র সমীক্ষা কি বলছে?
আমার কথা, ৩০ এপ্রিল
রাজীব দত্ত, পশ্চিম বর্ধমান:
রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচন শেষ, এখন অপেক্ষা ফলাফলের। এই রাজ্যের মসনদে কে বসবে, অর্থাৎ প্রত্যাবর্তন নাকি পরিবর্তন ঘটতে চলেছে তার জন্য অপেক্ষা আগামী ৪ঠা মে-র। এদিকে পশ্চিম বর্ধমান জেলার ভোট প্রথম দফায় অর্থাৎ ২৩ এপ্রিল অনুষ্ঠিত হয়েছে। এই জেলার নয়টি কেন্দ্রের ভাগ্যগণনা করে ফেলেছেন জনতা জনার্দণ। ‘আমার কথা’ থেকে বুথ ফেরত সমীক্ষা কি বলছে?
পশ্চিম বর্দ্ধমানের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র আসানসোল উত্তর। গত তিনবারের বিধায়ক তথা রাজ্যের মন্ত্রী মলয় ঘটক এই কেন্দ্রের প্রার্থী। তাঁর মূল লড়াই বিজেপি প্রার্থী কৃষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের সাথে, যে কিনা মলয় বাবুর একসময়ের রাজনৈতিক সহযোগী। ২০২১ সালে বিধানসভায় এবং ২০২৪ সালে লোকসভায় তৃণমূল ভোট পায় যথাক্রমে ৫২.৩৩℅ এবং ৪৬.৮%। অপরদিকে বিজেপি ভোট পায় যথাক্রমে ৪১.৩৮% এবং ৪৪.৬৫%। উভয়দলের ভোট পার্থক্য ১০.৯৫℅ থেকে কমে দাঁড়ায় মাত্র ২.১৫% এ। যদিও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে লোকসভা আর বিধানসভায় মানুষের ভোট দেবার চিন্তা ভাবনা আলাদা হয়, এই ভোট পার্থক্য এতটা চিন্তার বিষয় নয় কারণ এলাকার ‘আগুরি’ গোষ্ঠীর অধিকাংশ ভোট এখনো মলয় বাবুর সাথেই আছে। তাই ভোটব্যবধান কমলেও এই আসনটি শেষ পর্যন্ত তৃণমূলের দখলেই থাকবে বলে বিষেশজ্ঞরা মনে করছেন।
আসানসোল দক্ষিণ, এই আসনটি গতবার গিয়েছিল বিজেপির দখলে। বিজয়ী প্রার্থী অগ্নিমিত্রা পল এবারও বিজেপির হয়ে দাঁড়িয়েছেন। এদিকে তৃণমূলের হয়ে লড়ছেন বহুযুদ্ধের সেনানী প্রবীণ রাজনীতিবিদ তাপস বন্দোপাদ্ধায়। শুধু তাই নয় তিনি আবার এই কেন্দ্রের প্রাক্তন বিধায়ক। ফলে এলাকা তাঁর পরিচিত এবং লড়াই হয়ে উঠেছে হাই ভোল্টেজ। এর আগে তাপস বাবু দলনেত্রীকে রাণীগঞ্জের হারা আসন জিতেয়েছেন ২০২১ সালের নির্বাচনে। এবার দল তাঁকে দায়িত্ব দিয়েছে আসানসোল দক্ষিণ আসন পুন:রুদ্ধার করার। কাজটি কঠিন হলেও এবারেও তাপস বাবু সফল হবেন বলে বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন। রানিগঞ্জ কেন্দ্রে এইবার তৃণমূল প্রার্থী বদল করেছে। গতবারের বিজয়ী তাপস বন্দোপাধ্যায়কে সরিয়ে প্রার্থী করা হয়েছে কালো বরণ মণ্ডলকে। আর বিজেপি প্রার্থী করেছে কলকাতা হাইকোর্টের আইনজীবী পার্থ ঘোষকে। মাঝে একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়, যখন বিজেপি প্রার্থীর প্রাক্তন স্ত্রী তৃণমূলে যোগদান করেন। তিনি পার্থ ঘোষকে নিয়ে অনেক অভিযোগ করেন। এদিকে তৃণমূল প্রার্থীকে নিয়েও শোনা যায় নানা কানাঘুষো। যদিও শেষ পর্যন্ত আসনটিতে বিজেপিরই পাল্লা ভারী বলে ওয়াকিবহাল মহল মনে করছে।
জামুড়িয়া কেন্দ্রের লড়াই মুলত ত্রিমুখী, তৃণমূল, বিজেপি ও বাম প্রার্থীর মধ্যে। যদিও ২০২১ সালের বিধানসভায় যেখানে ১৪.৮৯% বাম ভোট ছিল,ড়ি সেটাই ২০২৪ সালের লোকসভায় কমে ১২.৯২% হয়ে যায়। যেখানে বিজেপির ভোট ৩৭.৭৭% থেকে বেড়ে ৩৮.১১% হয় এবং তৃণমূলের ভোট ৪২.৬% থেকে বেড়ে ৪৫.০৩% হয়। কিন্তু ২০২১ সালের জয়ী তৃণমূল প্রার্থী হরেরাম সিং এর সামনে রয়েছে অনেকগুলি সমস্যা। একে তিনি তাঁর ছেলের বিতর্কিত কিছু কর্মকাণ্ড নিয়ে বিব্রত, যা কিনা দলনেত্রী একেবারে ভরা সভায় সবার সামনে তাঁকে সতর্ক করেন। পাশাপাশি রয়েছে জামুড়িয়ার বিভিন্ন অংশে বহু কারণে প্রচুর ক্ষোভ, যাতে ঘৃতাহুতির কাজ করছে প্রচারের শেষলগ্নে একটি জলাধারের ভেঙে পড়া,যে ঘটনায় মৃত্যুও হয় দুজনের। সব মিলিয়ে এই আসনটি যেতে চলেছে বিজেপির ঘরে।
পাণ্ডবেশ্বর বেশ চর্চিত একটি আসন। যেখানে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন দুই পুরোনো প্রতিপক্ষ বিজেপির জিতেন তিওয়ারি এবং তৃণমূলের নরেন চক্রবর্তী। গতবার এখানে জিতেছিলেন নরেন চক্রবর্তী। এবার নির্বাচনের বিজেপির প্রার্থী ঘোষণার আগে জিতেন বাবু বিভিন্ন ইস্যুতে পাণ্ডবেশ্বরে হাজির হয়ে নরেন বাবুকে নিশানা করতেন।তারপর বিজেপির প্রার্থী ঘোষণা হলো। জিতেন বাবু প্রচার শুরু করলেন। প্রথমদিনই ইসিএলের উচ্ছেদ নোটিশকে নিয়ে আবার নরেন বাবুকে নিশানা করলেন। প্রচার শেষ হলো। নির্বাচনের দিন কোনো এক অজ্ঞাত কারণে জিতেন বাবুকে আর নির্বাচন কেন্দ্রে দেখা গেল না। তিনি ফেসবুক পোস্ট করলেন ‘নরেন হারছে’। সবমিলিয়ে কেমন যেন ব্যাপার স্যাপার। যাই হোক আসনটি আবার তৃণমূলের দখলেই থাকছে বলে এলাকাবাসীর ধারণা।
দুর্গাপুর পূর্ব, গতবার এই আসনটি জিতেছিল তৃণমূল। জয়ী প্রার্থী প্রদীপ মজুমদার এবারও তৃণমূলের প্রতিনিধি। বিজেপির হয়ে প্রার্থী হয়েছেন চন্দ্রশেখর বন্দোপাধ্যায়। প্রথম দিকে যদিও বহু প্রতিকুলতার সমুক্ষীন হতে হয়েছে তৃণমূল প্রার্থীকে, পরবর্তীকালে মুলত এসআইআর সংক্রান্ত ক্ষোভকে কাজে লাগিয়ে এবং দলনেত্রীর সভা ও রোড শোকে কাজে লাগিয়ে তিনি পরিস্থিতি সামলে নেন। আসনটি তৃণমূলই দখলে রাখবে, যদিও মার্জিন কমবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
দুর্গাপুর পশ্চিম গত দুইবার আসনটি বেহাত হয়েছে তৃণমূলের। এবার তাই প্রার্থী করা হয়েছে রাজনীতিতে সম্পুর্ন নতুন শহরের উদ্যোগপতি তথা দুর্গাপুর মহকুমা হাসপাতালের রোগী কল্যাণ সমিতির চেয়ারম্যান কবি দত্তকে। অবশ্য বিজেপির প্রার্থী হয়েছেন গতবারের বিজয়ী লক্ষ্মণ ঘড়ুই। কিন্তু তাঁর বিরুদ্ধে রয়েছে বহু ক্ষোভ। অপরদিকে কবি বাবুকে যেমন তৃণমূল দলের মধ্যে কবিবাবুকে নিয়ে রয়েছে ক্ষোভ। এছাড়াও দুর্গাপুরের ব্যবসায়ী মহলের অনেকেই শোনা যায় কবি বাবুর প্রতি রুষ্ট। তথাপি দলনেত্রীর তাঁর প্রতি বিশ্বাস ও শেষ মূহুর্তে প্রাক্তন মহানাগরিক অপুর্ব মুখার্জিকে সাথে নিয়ে আসা এবং পরিশেষে কবি বাবুর ব্যবসায়িক বুদ্ধি তাঁকে সামান্য হলেও এগিয়ে রাখছে বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহল। ফলে এই আসনে একটু হলেও এডভান্টেজ তৃণমূল।
সারা রাজ্যে প্রথম দফার ১৫২টি আসনের মধ্যে তৃণমূল ৮০- ৯০ টি
বিজেপি ৬০-৭০টি, বাম/ কংগ্রেস ৪-৫টি, অন্যান্য – ২-৩টি আসন পেতে পারে।
দ্বিতীয় দফার ভোটে ১৪২ টি আসনের মধ্যে তৃণমূল ১০০-১১০টি, বিজেপি ৩০-৩২ টি, বাম / কংগ্রেস – ২-৩ টি আসন পেতে পারে বলে মনে করছেন আমাদের বিশেষজ্ঞরা।



