সিটিসেন্টারে প্রমিলাদের ‘মিনা-বাজার’
আমার কথা, দুর্গাপুর, ১৭ আগস্ট:
সংবাদদাতাঃ প্রণয় রায়

ওরা সবাই দুর্গাপুর সিটি সেন্টার এর নন্ কোম্পানী হাউসিং কলোনীর বাসিন্দা। ঘর সংসার তো সবারই আছে, ছেলেমেয়ের দেখভাল, সংসার কর্মযজ্ঞে সবার সব রকম চাহিদা মিটিয়ে মাঝে মাঝে জীবনটা বড় একঘঁয়ে হয়ে যায়। অথচ ওদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ আছে, দল বেঁধে আড্ডা গল্প, সবার বিপদে আপদে ঝাঁপিয়ে পড়া সবই আছে।
ওরা হল মিঠু,পন্পা, পায়েল,তনুশ্রী,দেবলীনা, সুতপা,রূপালী, বর্ণালী ও শিপ্রা। একটা ভালো কিছু করার নেশায় ওরা নন্ কোম্পানী রিক্রিয়েশন ক্লাবে এক মহিলা হাট বসানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিল।২০২৪ সাল। এ এক মজার হাট। মোঘল আমলে সম্রাট হুমায়ুনের সময় থেকে শুধুমাত্র মহিলাদের জন্য নওরোজ অর্থাৎ নববর্ষের সময়ে সাত আট দিন ধরে মীনা বাজার বসতো। এই বাজারে ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয়ই থাকতেন মহিলারা।
ভারতবর্ষের অনেক জায়গায় এখন ও শুধুমাত্র মহিলাদের জন্য মীনা বাজার এর আয়োজন করা হয়। নন্ কোম্পানী রিক্রিয়েশন ক্লাবে ১৫ ই আগস্ট থেকে তিনদিনের এই মহিলা হাটের আয়োজন করা হয়। এখানে প্রধানতম মহিলারাই বিক্রেতা। ক্রেতা ও মুখ্যত মহিলারা হলেও পুরুষেরাও কেনাকাটা করতে এসেছেন।
দুর্গাপুর, বাঁকুড়ার শালতোড়া থেকে শুরু করে আশেপাশের এলাকার প্রচুর মহিলা কর্মোদ্যোগী এই মহিলা মিনা বাজার বা মহিলা হাটে অংশ নেন। বেশিরভাগ অস্থায়ী বিপনীগুলোই দেখলাম বুটিকের কাজ করা মহিলাদের সালোয়ার কামিজ, শাড়ী ব্লাউজ,ব্যাগ তারপর বিভিন্ন ধরনের ওয়েস্টার্ন পোশাকের সম্ভারের বিপুল সমারোহ। সাজসজ্জার জুয়েলারির সম্ভার ও আছে। আর আছে জিভে জল আনা খাবারের দোকান।
আয়োজক সংস্থার পক্ষ থেকে মিঠু চৌধুরী আলাপ করিয়ে দিলেন বিভিন্ন বিপনীর বিক্রেতাদের সঙ্গে।
আলাপ হল শুভম কালেকশন,অমরাবতীর জয়তী মুখার্জির সঙ্গে। জয়তী জানালেন বুটিকের সামগ্রী বিক্রি করা তার পেশা।উনি বিভিন্ন মহিলা হাটে অংশ নেন ও বিক্রি বাটাও মন্দ নয়। এতে সংসারেরও সাশ্রয় হয়।
সেল কো-অপারেটিভ কলোনির কবিগুরুতে থাকেন পারমিতা শ্যাম। তার বুটিক সেন্টারের নাম পারমিতা কালেকশন। মহিলাদের ব্যবহার করার মত বিভিন্ন বুটিকের সামগ্রী নিয়ে তিনি সাজসজ্জা আয়োজিত এই বিকি কিনির মেলায় এসেছেন। বিক্রি বাটা মন্দ নয়। জানালেন এটা তার নেশা। স্বাবলম্বী হয়ে একটা কিছু করার নেশায় তিনি এই বুটিকটি খুলেছেন।
বেনোচিতির মনীষা পাল প্রচুর জুয়েলারি সোমবার নিয়ে এসেছেন সাজসজ্জার হাটে। ওনার প্রতিষ্ঠানের নাম রেজিম জুয়েলারী। উনি বিভিন্ন ধরনের ফুল সংরক্ষণ করে তা দিয়ে মহিলাদের হাতে,গলায়, কানে পরার গয়না, নেমপ্লেট ইত্যাদি নিজের হাতেই তৈরি করেন। তার তৈরি এই সামগ্রী গুলি অত্যন্ত জনপ্রিয়। ছেলেবেলা কেটেছে কেরালায়। স্বামী এনআইটি তে চাকরি করেন। না সাংসারিক প্রয়োজনে না মনের আনন্দে তিনি এই কাজ করেন।
বুটিক আম্রপালী চালান সংহিতা চক্রবর্তী। হ্যান্ডলুম ও কটনের শাড়ী, ও নানান ধরণের পোশাক বিক্রি করেন। থাকেন সেপকো টাউনশীপে। ওখানে তার একটি পোশাক সামগ্রীর দোকান আছে।
আদিবাসী মেয়েদের স্বনির্ভর করতে ২০১৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় ইস্পাত নগরীর শরৎচন্দ্র এভিনিউ র একটি কোয়ার্টারস এ দুর্গাপুর স্নেহছায়া। বর্তমানে দশটি আদিবাসী মেয়ে এখানে বিভিন্ন ধরনের বুটিকের শাড়ি থেকে শুরু করে মহিলাদের পরনের নানা রকম সামগ্রী তৈরি করে। ওদের এই কাজ শেখানোর জন্য কয়েকজন শিক্ষিকা ও আছেন। এই মেলায় উপস্থিত ওদেরই একজন মঙ্গলী টুডু জানালো ম্যামদের উৎসাহ ও পরিশ্রমে ওরা আজ নিজেদের রোজগারের পথ খুঁজে পেয়েছে। সাজসজ্জার এই মেলায় আসতে পেরে ওর খুব ভালো লাগছে।
অনেকক্ষণ ধরেই জিভে জল আনা নানান স্বাদের খাবারের ঘ্রান পাচ্ছিলাম। ওদের স্টলে যেতেই দেবলীনা, সুতপা ও রুমকী বলল কি খাবেন। একটা ভেজিটেবল চপ চাইলাম। চপে একটা কামড় দিয়েই মনটা ভরে গেল আহা কি স্বাদ। কি নেই ওদের স্টলে, ডিমের ডেভিল, ফুচকা চুড়মুড় ভাজা, তালের বড়া সহ আরো কত কি। ভেজ রাইস ও আছে দেখলাম।
দুর্গাপুরের আরা, থেকে এসেছেন মৌসুমী দাস তার রেহানা বুটিক নিশে। বাড়িতেই বুটিকের সামগ্রী তৈরি করেন।এটা তার পেশা নয় , নেশা। দুজন মহিলা কাজ করে।চাকরি করতেন। চাকরী ছেড়ে স্বাবলম্বী হবার নেশায় ব্যবসা শুরু করেছেন। আমাকে বললেন বেশ জমিয়ে এই ব্যবসাটা করার ইচ্ছা আছে। বাড়ির লোকের সহযোগিতা তো পাচ্ছিই। আমি ভাবলাম বাঙালি ব্যবসা বিমুখ হলেও বাঙালি মহিলারা কিন্তু আজ সর্বক্ষেত্রেই এগিয়ে চলেছেন।
এলাম আদর্শনী বুটিক এর স্টলে। এর মালকিন অর্পিতা পাল থাকেন ৫৪ ফুট এ। সেখানে তার দোকানও আছে। জানালেন সংসারে স্বচ্ছলতা আনতে তার এই ব্যবসা। সংসার কে সাহায্য করতে পারছেন এটাই তার আনন্দ। বললেন বিক্রি বাটা খারাপ নয়।
শালতোড়া থেকে এসেছেন পাঞ্চালি কর্মকার।ফালতুড়ায় তাদের শালতোড়ায় তাদের পারিবারিক বুটিকের ব্যবসা। গত আট বছর ধরে তিনি এই ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। চাকরি থেকে অবসর নেওয়া তার স্বামী ও তাকে তাকে সব রকম সহায়তা করেন। তিনি কুর্তি শাড়ী, নাইটি ইত্যাদি বিক্রি করেন। কলকাতা দিল্লী বিভিন্ন জায়গা থেকে তার বিক্রির সামগ্রী আসে।স্বাধীনভাবে কিছু রোজগার করতে পেরে তিনি অত্যন্ত খুশি। এই মেলায় এসে তার ভালো লাগছে এই জন্য তার মত আরও অনেক মহিলাই এই ব্যবসায় জড়িত হয়েছেন দেখে।
দেবশ্রুতি দাস সিটি সেন্টারের নন কোম্পানির মেয়ে। কলকাতায় চাকরি করেন। তার মা শাশ্বতী দাস চারুলতা বুটিক চালান।মাকে সাহায্য করতে তিনি সাজসজ্জা আয়োজিত এই মহিলা হাটে বিকি কিনির পশরা নিয়ে বসেছেন ।
এই অভিনব হাটে একমাত্র পুরুষ বিক্রেতা অতনু সাহা। অতনু পলাশডিহা থাকেন। দুর্গাপুর হাটে তার একটি স্থায়ী স্টল আছে। তিনি পুরুষ ও মহিলাদের ব্যবহার করার নানা রকম চামড়া ও প্লাস্টিকের ব্যাগ ব্যাগের সামগ্রী নিয়ে স্টল দিয়েছেন। এ থেকেই তার সংসার নির্বাহ হয়।
এই অভিনব মীনা হাটে কেউ একটা কিছু করার নেশা আবার কেউ পেশা হিসেবে এসেছেন বিক্রিবাটার আশায়। সামনে পুজো আসছে। তাই একই ছাদের নীচে এত প্রয়োজনীয় সামগ্রীর বিকিকিনির হাটে সবাউ একবার এসে সব কিছু যাচাই করে দেখতে পারেন।দেখলেই কিনতে হবে তার কোন মানে নেই।তবে মহিলা কর্মোদ্যোগীদের উৎসাহ দিতে একবার আসতেই পারেন। এই মেলা কিন্তু আগামী কাল ১৭ আগস্ট শেষ হয়ে যাবে।



