দুর্গাপুর শ্রুতিরঙ্গম এর বিংশতিতম বার্ষিক অনুষ্ঠান
আমার কথা, দুর্গাপুর, ১৭ আগস্টঃ
সংবাদদাতাঃ প্রণয় রায়
১৫ ই আগস্ট ছিল আমাদের দেশের ৭৮তম স্বাধীনতা বার্ষিকী। এদিন সৃজনী প্রেক্ষাগৃহে আয়োজিত হল দুর্গাপুর শ্রুতি রঙ্গমের বিংশতি তম বার্ষিক অনুষ্ঠান। প্রেক্ষাগৃহে জুড়ে ছিল অসংখ্য শিশু কিশোর তরুণ তরুণী মাঝবয়সী বেশি বয়সী সব বয়সী পুরুষ ও মহিলাদের ভিড়। সবাই উপস্থিত ছিলেন এক নান্দনিক অনুষ্ঠানে। মনে পড়ল অনেক বছর আগে পড়া শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের এক রূপকথার গল্পে এক রাজামশাই তার মেয়ের স্বয়ংবর সভায় আসা সুঠাম চেহারার তরুণ রাজকুমারকে বলছেন কোথা থেকে এসেছো। সেই তরুণ মিষ্টি কন্ঠে বলল আমি তাল তমালের দেশ বাংলা থেকে এসেছি। রাজা মশাই নড়েচড়ে বসলেন। তার পাশে স্বয়ংবর সভার কনে হয়ে বসে থাকা রাজকন্যা ও। রাজা বললেন সেখানকার মানুষেরা নাকি পাখির ভাষায় কথা বলে। সে তরুন রাজপুত্র বলে ঠিকই বলেছেন আমাদের বাংলা ভাষা বড় মিষ্টি ভাষা। রাজকন্যা স্মিত হসে তার দিকে তাকান। না এখন সে গল্প নয়। কারণ আজ দোয়েল শ্যামার মিষ্টি কন্ঠস্বরের মত কি মিষ্টি মোদের গরব মোদের আশা আমরি বাংলা ভাষায় সাজানো এক অপরূপ সুন্দর অনুষ্ঠানের মালা গলায় পরে উপভোগ করব দুর্গাপুর শ্রুতি রঙ্গমের বিংশতিতম বর্ষের অনুষ্ঠান। তিন থেকে তেষট্টি বছর বয়সী শিশু কিশোর তরুণ তরুণী ও বিভিন্ন বয়সী রা দুর্গাপুর শ্রুতিরঙ্গম এর সম্পদ।
আকাশে একরাশ মেঘ সাথে থাকুক না ফোঁটা ফোঁটা বৃষ্টি। তার মধ্যেই প্রেক্ষাগৃহের বাইরে উড়ল বেলুন। সৃজনীর বাইরের আকাশ জুড়ে শুধু তখন বেলুন আর বেলুন। আমরাও বেলুনের দড়ি ধরে উড়তে উড়তে প্রবেশ করলাম প্রেক্ষাগৃহে। শুরু হলো রবীন্দ্রনাথের ভারত তীর্থ কবিতার এক অপরূপ কোলাজ। মঞ্চজুড়ে শুধু তখন শ্রুতি রঙ্গমের অসংখ্য শিল্পী। কি অপূর্ব পরিবেশনা।
আজ তো স্বাধীনতা দিবস তাই শহীদ স্মরণে কিছুটা সময়। শ্রুতি রঙ্গমের মহিলা সদস্যরা মঞ্চে তৈরি এক অস্থায়ী শহীদ বেদীতে যে বেদী স্বাধীনতা সংগ্রামীদের স্মৃতিতে তৈরি করা হয়েছে সেখানে পুষ্পার্ঘ্য ও মাল্য দান করে অনুষ্ঠানের সূচনা করে। খুব ভালো লাগলো কোন অতিথিকে মঞ্চে আহ্বান করে অনেকটা সময় নষ্ট করে উদ্বোধনী অনুষ্ঠান না করার জন্য।
এরপর আজকের দিনের সঙ্গে সাযুজ্য রেখে এই আমার দেশ সমবেত আবৃত্তির অনুষ্ঠান । আজকের দিনের জন্য এটি অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক একটি অনুষ্ঠান।
অনুষ্ঠানের শুরুতেই সেই যে বলেছিলাম না আমার মিষ্টি বাংলা ভাষার কথা সে ভাষা নিয়েই এর পরের অনুষ্ঠান বাংলার কথা।
আর শ্রুতি রঙ্গমের অনুষ্ঠান হবে সেখানে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কিছু রচনা থাকবে না তো কি করে হয়। রবি ঠাকুরের নারী চরিত্রগুলোকে নিয়ে এক সুন্দর কোলাজ।
শম্পা কুন্ডু ঘোষণা করল আমরা করব জয়। এরপর নিশানা উড়ে যাওয়ার নিশানা উড়িয়ে মঞ্চে ঢুকলো শ্রুতি রঙ্গমের শিল্পীরা।
আজ দিকে দিকে বারুদের গন্ধ বাজছে যুদ্ধের দামামা। শান্তির পারাবত না ওড়ালে বিশ্বের যুদ্ধবাজরা যে থামতেই চায় না। যুদ্ধবাজদের সতর্ক করতেই যেন শ্রুতিরঙ্গমের শিল্পীরা পরিবেশন করলো যুদ্ধ নয় শান্তি চাই।
আজকাল নারীরা ভালো নেই। আরো ভালো নেই আমাদের শিশু, কিশোরী কন্যারা। কোথাও ভ্রুনেই তাদের হত্যা করে দেওয়া হচ্ছে বা অপরিণত বয়সেই বিয়ে দেওয়া হচ্ছে কিংবা কারণে-অকারণে ওরা অত্যাচারিত হচ্ছে। তাই ওদের বাঁচাতে ওদের রক্ষা করতে এবারের অনুষ্ঠান ছিল বেটি বাঁচাও।
এভাবেই চলতে থাকল একটার পর একটা অনুষ্ঠান।
হঠাৎ ছু মন্তর ছু ইচ্ছে আমার ইচ্ছে তোমার ঘোষণা করলেন চন্দ্রা পাঁজা। সে এক ভারি মজার অনুষ্ঠান। ভালো ছেলে, এমন কি আর খাই, কাজের লোক, মাগো আমার মা এই ধরনের কত অনুষ্ঠান। অনুষ্ঠান দেখতে দেখতে সবাই মজে যাচ্ছি আর ভাবছিলাম কত পরিশ্রম নিয়ে এই অনুষ্ঠানগুলো উপস্থাপনা করে শ্রুতি রঙ্গমের কথা শিল্পীরা।
খাওয়া দাওয়া নিয়ে ও বেশ মজার আবৃত্তি অনুষ্ঠান
সব ধরনের অনুষ্ঠান থাকবে অথচ স্বপ্ন দেখানো অনুষ্ঠান থাকবে না এ কি করে হয় তাই স্বপ্নওয়ালা ও এল তার কবিতার ঝাঁপি নিয়ে। এরপর এক একটা যে স্বপ্নের কবিতা বেরিয়ে এলো তার ঝোলা থেকে কি বলবো। যে স্বপ্নের মধ্যে দিয়ে ওরা জানাল উই শ্য়াল ওভার,কাম।
সত্যি এত দূষণ চারধারে তার প্রভাব পড়তে শুরু করেছে গলে যাচ্ছে মেরু। বাড়ছে গরম। বাড়ছে বৃষ্টি। প্রকৃতির সর্বনাশ করায় ভাঙছে পাহাড় আকাশ ভেঙ্গে বৃষ্টি ভেসে যাচ্ছে সবকিছু। এখনো সুস্থভাবে বাঁচতে হলে চাই সবুজ পৃথিবী। উন্নয়নের সাথে সাথে শেষ হচ্ছে গাছপালা। কমছে অক্সিজেন। হচ্ছে ভূমিক্ষয়। তাই শিশুরা তাদের সমবেত কবিতায় আমাদের শোনাল হারিয়ে যাওয়া গাছপালার কথা। দুর্বিষহ প্রকৃতির দুরবস্থার কথা।ওরা প্রশ্ন রাখলো এ প্রকৃতি কে বাঁচাবে।
যে গাছপালা। শ্রুতি রঙ্গমের শিল্পীরা তাইতো তাদের এর পরের অনুষ্ঠানে পার্থপ্রতিম কুণ্ডু ডাক দিলেন
এস সবুজ পৃথিবী গড়ি।
আজ জাত পাত ধর্মে ধর্মে বিভেদ আমাদের সবার মধ্যে অবিশ্বাসের বাতাবরণ দিন দিন বাড়িই চলেছে। এর অবসান চাই তাইতো সঞ্চিত সিনহা ঘোষণা করল আমাদের এবারের অনুষ্ঠান জাত ভুলে যাও ধর্মভোলো। নজরুলের সেই বিখ্যাত কবিতা জাতের নামে বজ্জাতি সব কবিতা পাঠ করতে করতে শিশুরা প্রশ্ন রাখলো আমাদের সবার সামনে কি আমাদের জাত আর ধর্মই বা কি? সত্যিই তো শিশুরা যা বলল অবলীলাক্রমে তা আমরা মানতে পারি না কেন? ওরা কি সুন্দর বলল আমি সে ধর্ম মানিনা যে ধর্ম আমাদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করে।
আহা এভাবেই তো সব ভেদাভেদের বেড়া ভেঙে আজ সম্প্রীতির ডাক দিতে হবে সর্বত্র যা দিল শ্রুতি রঙ্গমের শিশুদের অনুষ্ঠান।
শ্রুতি রঙ্গমের প্রাণ পুরুষ না বলে বলি প্রান মহিলা আসলে প্রাণপুরুষ কুন্তল রায়। কুন্তল রায় থাকে নেপথ্যে আর প্রাণ মহিলা কাকলি রায় সামনে কাকলি তার সুললিত কন্ঠস্বরে ঘোষণা করল আমাদের এবারের অনুষ্ঠান পথের শিশু আমরা যীশু। আমাদের জীবনে ওরা কতটা গুরত্বপূর্ণ তা নিয়ে জানাল কাকলি রায়। দেখলাম মঞ্চে একদল শিশু তাদের সাবলিল মনন নিয়ে জানাল ওরা হতে পারে বস্তিবাসী কিন্তু শত অভাব, দারিদ্র্যর মধ্যেও মোটা ভাত আর মোটা কাপড় নিয়েই সন্তুষ্ট। জীবনে কত যন্ত্রণা কেউ ভাঙছে কয়লা কেউ ঠেলছে ঠেলা। ওদের আকাশ অন্ধকারের মেঘে ঢাকা হলেও ওরা ও আলোর সন্ধানী। পথে ময়লা কুড়াতে গিয়ে কুড়িয়ে পাওয়া বই দিয়ে বেঁচে থাকার আলোর সন্ধান করে ওরা।এক অসাধারণ অনুষ্ঠান করল এই পথ শিশুরা। কাকলি বললো এই যে এই পথ শিশুরা যারা আজ এই অনুষ্ঠানে অংশ নিল ওদের অধ্যাবসায় ও ইচ্ছে এত সুন্দর একটা অনুষ্ঠান উপহার দিতে সাহায্য করল। একজন পথ শিশুর পড়াশোনার দায়িত্ব নিল শ্রুতিরঙ্গম।
কাকলি জানাল এ সময়ে আমরা ভালো নেই তাই আমাদের ভাল কর হে ভগবান।মাটির পৃথিবী হোক স্বর্গ সমান।
ওর কথার রেশ টেন মঞ্চে উপস্থিত একশ র উপর শিশু কিশোররা সম্মিলিত কন্ঠে উচ্চারণ করল মাটির পৃথিবী হোক স্বর্গ সমান। ওদের এ স্বপ্ন হোক
এদিনের শেষ নিবেদন ছিল কলকাতার জনপ্রিয় আবৃত্তি সংস্থা শঙ্খমালা পরিবেশন করলো কলকাতা শহরের ইতিহাস নিয়ে জনপ্রিয় শ্রুতি নাটক জলস্রোত কথা কয়। শ্রুতি নাটকের পরিচালনা ও অভিনয়ে বিশিষ্ট আবৃত্তি শিল্পীন সুমন্ত্র সেনগুপ্ত। নব্বইতম প্রযোজনা। কলকাতা শহরের ইতিহাস। রচনা কৌশিক রায় চৌধুরী।
বাংলার সুবেদার শায়েস্তা খানের সময় থেকে তখনকার সুতানটির এক টুকরো ছবি নিয়ে শুরু হল জলস্রোত কথা কয়। ১৬৯০ তে প্রতিষ্ঠিত হল কলকাতা। কথার পর কথা সাজিয়ে সুতোনাটি, গোবিন্দপুর ও কলকাতা এই তিনটি গ্রামের ধীরে ধীরে কলকাতা হওয়ার গল্প।
কবি গান, খিস্তি খেউর এর কলকাতা। ভোলা ময়রার কবিগান, বাবু কালচার সব কিছু নিয়ে তখন কলকাতা এগোচ্ছে। বাবু কালচারের তখন জয়গান সর্বত্র সেই বাবুদের নিয়ে কত উপাখ্যান উঠে এল জলস্রোত কথা কয় বাচিক নাটকে।
এল নাটক। নাট্যকার অমৃতলাল এর নাটক তখন রমরম করে চলছে।
আজব শহর কলকেতার সেই সময়ের নানান কথকতা নিয়ে এক অসাধারণ পরিবেশনা। কবিগানের মোড়ক ও সুরে আবার কখনও শুধু কথা এসব নিয়েই জলস্রোত গল্প বলে গেল।
বঙ্কিম, মধুসূদন,জগদীশচন্দ্র, গিরিশ চন্দ্র,নটী বিনোদিনী,সিমলে পাড়ার নরেন, রামকৃষ্ণ পরমহংসদেব , কার কথা নেই জলস্রোত কথা কয় নাটকে। ভবে একা দাও হে দেখা নটী বিনোদিনীর সেই অসাধারণ গানটি পরিবেশন করলেন নটী বিনোদিনীর চরিত্রাভিনেত্রী। কখন ও গান, কখনও অভিনয়, কখনও কথার মালা সব কিছু নিয়ে জলস্রোত কথা কয়। এলেন রবীন্দ্রনাথ। রবীন্দ্রনাথের বাল্মিকী প্রতিভা থেকে শুরু করে রবীন্দ্রনাথের রাখী উৎসব। এল স্বাধীনতা সংগ্রামের কাহিনী। এত ঘটনার ঘনঘটা এত স্বল্প পরিসরে পরিবেশিত হচ্ছিল যার ফলে মাঝে মাঝে খেই হারিয়ে ফেলছিলাম। সুতানটি গোবিন্দপুর ও কলকাতা এই তিনটি গ্রামের কলকাতা হয়ে ওঠার এত কাহিনী এত কথকতাকে এত এত স্বল্প পরিসরে রূপায়ন করা খুব কঠিন। যার ফলে এত ঘটনার ঘনঘটায় মাঝে মাঝে খেই হারিয়ে ফেলছিলাম। ভালো লাগলো কবিগান ও রবীন্দ্রসঙ্গীতের ব্যবহার।
অসাধারণ টীম ওয়ার্ক। জলস্রোত নিরন্তরভাবে কথা বলে গেল।দীর্ঘশ্বাস ফেলল ইতিহাস। আর আমরা জলস্রোতের প্রবাহে কান পেতে অপেরাধর্মী শঙ্খমালার নাটকে অবগাহন করলাম।
সংস্থার পক্ষে কুন্তল রায় জানালেন তাদের সংস্থার ছাত্রছাত্রীরা ছাড়াও দুর্গাপুরের বিভিন্ন এলাকার পথ শিশুরা আবৃত্তি কোলাজে অংশ নিয়ে তাদের প্রতিভার স্বাক্ষর রাখে।



