ক্যামেলিয়ার কবিতা পাঠ অনুষ্ঠান
আমার কথা, প্রণয় রায়, দুর্গাপুর, ১২ ডিসেম্বর:

মহারাজ বিক্রমাদিত্যের রাজসভায় নবরত্ন সভাসদরা সবাই কুমারসম্ভব, মেঘদূত কাব্যের কাব্যকার ও বিক্রমাদিত্যের রাজসভার প্রধান কবি কালীদাসকে সবাই হিংসা করতেন তাঁকে মহারাজ বিক্রমাদিত্য বেশী পছন্দ করতেন বলে। একদিন সকালে রাজসভায় মহারাজ সবাইকে পরীক্ষা করতে রাজসভার প্রবেশমুখে একটা শুকনো ডাল রেখে সবাইকে বললেন বাইরে গিয়ে দেখতে ওখানে কি আছে। সবাই গিয়ে দেখলেন।এরপর এসে মহারাজকে বললেন ওখানে শুষ্ক কাষ্ট আছে। একজন এসে কাব্য করে
বললেন শুষ্কং কাষ্ঠং তিষ্টতি অগ্রে। অর্থাৎ ওখানে একটি শুকনো কাঠ আছে। এবার কালীদাসকে দেখে এসে কিছু বলতে বললেন মহারাজ। কালীদাস শুকনো কাঠটি দেখে এসে বললেন নীরস তরুবর পুরত ভাগে। বিক্রমাদিত্য র সভাসদরা এই বর্ণনায় নির্বাক নিস্তব্দ। মহারাজ বিক্রমাদিত্য বললেন আপনারা নিশ্চয়ই বুঝতে পেরেছেন কবি কালীদাস কেন আমার সবচেয়ে বেশী প্রিয়। ক্যামেলিয়া আয়োজিত কবিতার জন্য কিছুক্ষণ অনুষ্ঠানটিও যেন ঠিক তেমনি এক বিক্রমাদিত্যর নবরত্ন সভার মত রত্নখচিত কবি সম্মেলন। না এখানে বিক্রমাদিত্যর রাজসভার মত শ্রেষ্ঠত্বের লড়াই নেই। কারণ এই অনুষ্ঠানে উপস্থিত সব নির্বাচিত কবিই নিজ নিজ সৃষ্টির ক্ষেত্রে স্বমহিমায় উজ্জ্বল।
কবিরা কবিতা লেখেন হৃদয় নিংড়ে পরম মমতায়। নিজের মনেই পড়েন। কিন্তু শান্তি পান না। বুঝতে পারেননা তাদের এ কবিতা কতটা সৃষ্টিশীল বা কতটা শ্রুতিমধুর হয়েছে। কিন্তু কবিতার জন্য কিছুক্ষণ অনুষ্ঠানে যখন একজন বাচিক শিল্পী কবির কবিতা তার সুললিত কন্ঠে পরিবেশন করছেন এবং সবাই মুগ্ধ হয়ে শুনছেন তখন কবি অনুভব করেন তার কবিতা যেন প্রাণ পাচ্ছে। বুঝতে পারছেন জিহ্বায় উচ্চারিত প্রতিটি শব্দই কেমন কবিতা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ক্যামেলিয়ার এ এক মহা কবি সম্মেলন এবছর দশ বছরে পড়ল।
প্রথমে বেদ গান এরপর কীর্তনাঙ্গ রাগে যদি ঝড়ের মেঘের মত যাই চঞ্চল অন্তর এ এই রবীন্দ্র সঙ্গীত গেয়ে অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করলেন কাকলি চৌধুরী। প্রদীপ প্রজ্জ্বলন হল।
এরপর ক্যামেলিয়ার কর্ণধার দেবদাস সেন তার গৌরচন্দ্রিকায় বললেন আজ তার কোন কথা নয়।আজ কথা বলবে কবিতা।চিলড্রেনস আকাদেমি র এই মঞ্চে কবিতার সাগরে। আমরা সবাই অবগাহন করব।
হলো ও তাই। কবি পূর্ণ চন্দ্র মুখোপাধ্যায় বললেন
কবিতা বার বার বাঁক নিয়েছে পথ পরিবর্তন করেছে। তিনি বললেন কবিতা ভাঙতে ভাঙতে একদিন নতুন পথ খুঁজে পায়।অতৃপ্তি থেকে কবিতা সৃষ্টি।কবিতা জন্ম মৃত্যু,জীবনবোধ,হতাশা সব কিছুতেই আছে।
অনিরুদ্ধ রায় চৌধুরী বলেন আবৃত্তি করলেই আবৃত্তিকার হওয়া যায় না। তার জন্য প্রচন্ড অভ্যাস ও কবিতাটাকে বুঝে কবিতা আবৃত্তি করতে হবে।
এরপর কাকলী সেন আর কাকলী রায় তাদের সুমধুর বাচনভঙ্গিতে একে একে বাচিক শিল্পী ও কবিদের মঞ্চে আমণ্ত্রণ জানালো। শুরু হল উপস্থিত সবার কবিতায় অবগাহন করা।
বাচিক শিল্পী প্রসূন চট্টোপাধ্যায় তার ভরাট কন্ঠের কারুকার্যে কবি কৌশিক চট্টোপাধ্যায়ের কবিতা পাঠ করে কবিতার জন্য কিছুক্ষণ অনুষ্ঠানের সুর বেঁধে দিল। এরপর একজন বাচিক শিল্পী আর একজন কবি।বাচিক শিল্পী পড়ছেন কবির কবিতা আর কবি ভাবছেন তার সৃষ্টি স্বার্থক হল। আর দর্শকরা ও মুগ্ধ হয়ে বাচিক শিল্পীর কন্ঠে সেই কবির কবিতা পড়ছেন।
বাচিক শিল্পী ও কবিদের যুগলবন্দীর মধ্যেই মাঝে মাঝে কবিরা ও কবিতা পাঠ করছিলেন। মণিশঙ্কর, সোনালী বড়ুয়া,রঘুনাথ সিনহা, রূপালী মুখোপাধ্যায়
সহ অন্যান্যরা।
অনুষ্ঠান চলতে থাকল।
কখনও বাচিক শিল্পী পড়ছেন তার সামনে উপস্থিত কোন কবিতা আবার মাঝে মাঝে কবিরা ও সকন্ঠে পাঠ করছেন তাদের কবিতা।
আর মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে সবাই শুনছেন তাদের কবিতা। আনন্দ,দুঃখ, কষ্ট যন্ত্রণা, প্রতিবাদ সব কিছুর কবিতাই উচ্চারিত থাকলো মঞ্চ জুড়ে। আর শীতের কাঁপুনি উপেক্ষা করে উপস্থিত সবাই এক ভালা লাগা কবিতা সন্ধ্যয় কবিতার ছন্দ,কথা ও উচ্চারনে নিজেদের শরীর ও মনকে ভালো লাগার উষ্ণতায় ভরিয়ে তুললো।



