কন্ঠ নাটকে জীবনের জয়গান
আমার কথা, ৪ ফেব্রুয়ারী
প্রণয় রায়, দুর্গাপুর:

চারধারে কন্ঠে কন্ঠে ছয়লাপ। কথারা ছড়িয়ে পড়ছে। কখন ও ছন্দ হয়ে আবার কখনও সংলাপে।এ এক ভারি মজার অভিজ্ঞতা। আমাকে অনুষ্ঠানের আগেরদিন শ্রী জ্যোতির্ময় চক্রবর্তীর ভরাট কন্ঠে চলভাষে আমণ্ত্রণ। আগে আলাপ ছিল না। তবে ওনাদের মুকুর সংস্থার শ্রুতিনাটকের রস আস্বাদন করার সুযোগ আগে হয়েছে। উনি বললেন অনুষ্ঠানে আসতে হবে।হোয়াটসঅ্যাপে আমণ্ত্রণ পাঠালেন। শুধু তাই নয় অনুঠানের দিন আবার মনে করিয়ে দিলেন যাতে সব কাজ ফেলে আমাকে যেতে হল।
সৃজনীর বিপিনচন্দ্র পাল সভাগৃহে ঢুকতেই সঞ্চিতা সাদর আমন্ত্রণে আমাকে দর্শক আসনে বসিয়ে দিল। তখন একটি শ্রুতি নাটক চলছিল। নাটকটি মুকুর শ্রুতি নাটক সংস্থার প্রাণপুরুষ জ্যোতির্ময় চক্রবর্তীর লেখা ভ্রুন।
মুকুর শ্রুতি নাটক গোষ্ঠী সম্প্রতি সৃজনীর বিপিন চন্দ্র পাল প্রেক্ষাগৃহে শ্রুতি নাটক ও সমবেত আবৃত্তি অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিল। মুকুর সংস্থার পরিচালক ও নাট্যকার জ্যোতির্ময় চক্রবর্তীর লেখা বেশ কয়েকটি শ্রুতি নাটক এদিন পরিবেশিত হলো।
জ্যোতির্ময় চক্রবর্তীর
ভ্রুণ নাটকটির সব চরিত্রই মহিলা। কন্যা ভ্রুণ হত্যার প্রচেষ্টা নিয়ে একটি মনকে নাড়া দেওয়া পরিবেশনা। একটি বাড়িতে প্রধান কর্তী শাশুড়ি। ছেলে অধ্যাপক। বৌমা জন্ম দিতে যাচ্ছে কন্যা সন্তান। শাশুড়ি চান কন্যা সন্তানকে ভ্রুণ অবস্থায় নষ্ট করে দিতে। কিন্তু বৌমা রাজি হয় না। বলে কন্যা সন্তানের জন্ম দেবার জন্য আমি একা দায়ী নই।এটা ক্রোমোজোম জনিত কারণে হয়। এবং পুরুষ রাই এর জন্য দায়ী। নারীদের কোন ভূমিকা নেই। শাশুড়ি তার কথা মানেন না। কন্যা সন্তান জন্ম নিলে বৌমা বাড়ি ছেড়ে চলে যায় । অনেক কষ্ট করে সেই কন্যা সন্তানকে মানুষ করে ও সেই সন্তান একদিন চিকিৎসক হয়। ততদিনে শাশুড়ির অনেক বয়স হয়েছে। তার সেরিব্রাল এটাক হয়েছে।এবং সেই চিকিৎসক নাতনি তার চিকিৎসা করে তার ঠাকুমাকে সুস্থ করে তোলে। ঠাকুরমা বুঝতে পারেন তার ভুল। কন্যা সন্তান হলেই সংসারের জঞ্জাল নয়। নাটকটা এত সুন্দর ভাবে উপস্থাপনা করা হলো যে নিবিষ্ট হয়ে
শ্রুতি নাটকটি শুনতে হয়। গল্পটি চোখে নাড়া দিয়ে আমাদের সমাজের কন্যা সন্তানের প্রতি অবহেলার পুরনো ধ্যানধারণাকে চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়। কিন্তু আমাদের দেশে তো জন্মের আগে মাতৃগর্ভে ভ্রুন নির্ধারণ করা যায় না। তবুও সমাজ সচেতন মূলক কাহিনী বলে নাটকটির পরিবেশনা ছিল যথাযথ।
পরবর্তী পরিবেশনা ছিল রূপনারায়নপুরের বলাকা গোষ্ঠীর আবৃত্তি আলেখ্য ধর্ম এবং মানুষ। ধর্ম শুধু চোখের ধুলো এই বার্তার মধ্যে দিয়ে বাঁচুক মানুষ বাঁচুক মনুষ্যত্ব বললেন বলাকার আবৃত্তি শিল্পীরা বিভিন্ন কবির কবিতার কোলাজে। সমবেত কবিতার কোলাজে এক সুন্দর পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছিল বিপিনচন্দ্র পাল সভাগৃহে। শিল্পীদের জড়তা হীন সুন্দর উচ্চারণ, সুন্দর কন্ঠের ওঠানামা সবই ছিল কিন্তু দুই একজন শিল্পীর র এর জায়গায় ঢ় উচ্চারণ কানে বাজছিল। এ বিষয়ে একটু সতর্ক হলে পরিবেশনাটি আরো শ্রুতি মধুর হবে।
পরবর্তী অনুষ্ঠান ছিল নাট্যকার জ্যোতির্ময় চক্রবর্তীর নাটক নট রিচেবেল। নাটকে তিনটি চরিত্র। স্থান একটি বৃদ্ধাশ্রম। দু কন্যা তাদের বসতবাড়ি বিক্রি করে মাকে একটি বৃদ্ধাশ্রমে পাঠায়। মিসেস মুখার্জি নামে সে মহিলা সেখানে গিয়ে পরিচিত হন পুরনো এক আবাসিকের সঙ্গে। সেই আবাসিক দিদিমণিকে তিনি বলেন মাত্র কদিনের জন্য তিনি এখানে এসেছেন। তার মেয়ে একটা ফ্ল্যাট কিনেছে।ফ্ল্যাটটা
সাজিয়ে গুছিয়েই মাকে নিয়ে যাবে। পুরানো আবাসিক মহিলা বলেন আপনার আর এখান থেকে যাওয়া হবেনা। তিনি তার কথা বিশ্বাস করেন না। বলেন তার মেয়েরা তেমন মেয়ে নয়। তিনি মেয়েকে নাতির পরীক্ষার ফলাফল জিজ্ঞেস করেন। মেয়ে বলে সে ব্যস্ত আছে পরে জানাবে। এরপর আবার ফোন করেন। মেয়ে বিরক্ত হয়ে ফোন ছেড়ে দেয় । তিনি তার অন্য মেয়েকে ফোন করেন। সেই মেয়ে তার ফোনই তোলেনা। শুধু একটা কথা ভেসে আসে নট রিচেবল। পুরানো আবাসিক মহিলা বলেন আপনার কোন মেয়েই আপনার ফোন ধরবে না। কারণ ওরা আপনাকে বৃদ্ধাশ্রম থেকে নিয়ে যাবে না। হল ও তাই। আবার যখন ফোন করেন চলোভাষে বেজে ওঠে একটা যান্ত্রিক কন্ঠ নট রিচেবেল।পুরানো আবাসিক মহিলা বলেন বলেছিলাম না আপনার মেয়ে আর ফোন ধরবে না। আপনাকে এখানে চিরদিনের জন্য রেখে গেল। হঠাৎ তিনি দেখেন সেই ভদ্রমহিলা আর কথা বলছেন না। তিনি মিসেস মুখার্জি মিসেস মুখার্জি বলে তাকে ডাকতে থাকেন। কিন্তু কোন উত্তর পান না।ছেলে মেয়েদের মানুষ করেও সংসারে এক সময় তারা স্থান পাননা।সন্তানরা হয়ে যায় সম্পর্ক হীন। বিশ্বাসহীনতার শোকে মিসেস মুখার্জি পরপারে চলে গেছেন। আরেকজন নতুন আবাসিক এসে বললেন তিনি ও মাত্র কদিনের জন্য এখানে এসেছেন। এরপর আবার বাড়ি ফিরে যাবেন। পুরানো আবাসিক মহিলা ক্লিষ্ট হেসে বলেন আপনাকে এখানেই থাকতে হবে। নাটকটি শুনতে শুনতে ভাবছিলাম আমাদের চারপাশে দিনদিন একাকীত্বের বৃদ্ধাশ্রম আমাদের গ্রাস করছে। ভারি সুন্দর লেখা।নিবিষ্ট মনে নাটকটা শুনতে হয়। চরিত্রগুলোর কন্ঠের ওঠানামা আরেকটু শ্রুতিমধুর হলে নাটকটি আরো মনোগ্রাহী হত।
শিল্প ও সাহিত্য পত্রিকার বাচিক সংস্থা খেয়াতরী এদিন দর্শকদের জীবনানন্দের কবিতার ডালি নিয়ে পরিবেশন করল কবি ও সাহিত্যিক রাজীব ঘাঁটির লেখা জীবনানন্দের একগুচ্ছ কবিতা নিয়ে এক অসাধারণ কবিতার কোলাজ। আবৃত্তিকাররা প্রত্যেকেই সচেতন ছিল তাদের পরিবেশনায় । সঞ্চিতা সিনহার পরিচালনা ছিল সত্যিই মনোমুগ্ধকর।
পরবর্তী পরিবেশনা ছিল জ্যোতির্ময় চক্রবর্তীর অন্ধকারের উৎস হতে উৎসারিত আলো।
নাটকের কুশীলব চারজন। একজন পুরুষ রোগী, একজন ডাক্তার ও একজন নার্স ও সেই রোগীর বৌমা। মাল্টিপল অর্গান ফেলিওর সিনড্রোম রোগে আক্রান্ত ৬৫ বছর বয়সের এক রোগীএক হাসপাতালের আই সি ইউ বিভাগে ভর্তি। প্রচন্ডরকম স্মৃতিভ্রংশতায় তিনি ভুগছেন। মানুষের উপর বিশ্বাস হারানোর যণ্ত্রণা তাকে কুরে কুরে খাচ্ছে। তিনি কাউকে চিনতে পারছেন না। ডাক্তার সুরঞ্জনা দাস তার চিকিৎসা করছেন। চেষ্টা করছেন তার স্মৃতিশক্তিকে ফিরিয়ে আনতে । বিদেশে থাকা বৌমা হাসপাতালে এসে তার শশুর মশাই এর শারীরিক উন্নতির খবর নেন। উদ্বেগ নিয়ে বলেন একটু সুস্থ হলে বাড়ি নিয়ে যাব । সুরঞ্জনা বলেন উনি ধীরে ধীরে সুস্থ হচ্ছেন।
এরপর সেই রোগী একটু একটু করে সুস্থ হতে থাকে। উনি প্রাক্তন চিকিৎসক ডাক্তার দাস। সুরঞ্জনা ডাক্তারি পড়ার সময় তারই ছাত্রী ছিল এবং তার জুনিয়র হিসেবে কাজও করেছে। ডাক্তার দাস একজন জঘন্য প্রবৃত্তির মানুষ। সরকারি হাসপাতালে তার চাকরি জীবনে রাজনৈতিক প্রতিপত্তি কাজে লাগিয়ে তিনি জাল ওষুধের কারবার নানা রকম জঘন্য কাজের সময় জড়িত ছিলেন। সুরঞ্জনার বান্ধবীকে তার লালসার শিকার হয়ে মৃত্যুবরণ করতে হয় । ডাঃ দাস তাদের হাসপাতালে ভর্তি হলে তার চিকিৎসার দায়িত্ব সুরঞ্জনার হাতে আসে।সুরঞ্জনা চিনতে পারে এই পশুরূপী চিকিৎসককে। ইচ্ছে হয় তাকে চরম শাস্তি দিতে। চিকিৎসক হয়ে এই চরিত্রহীন জঘন্য চিকিৎসক ডাক্তার দাসকে তার বান্ধবীর মৃত্যুর প্রতিশোধ হিসেবে বিষ ইনজেকশন দিয়ে মেরে ফেলতে পারতো। কিন্তু চিকিৎসক হিসেবে তার মানবিক মন নিয়ে ডাক্তার দাসকে বাঁচিয়ে দেয়। ডাক্তার দাসের স্মৃতিশক্তি ফিরে এলে তার সারা জীবনের কুকীর্তির জানা কথা ডাক্তার দাসকে জানিয়ে বলে আপনি এক জঘন্য প্রবৃত্তির ডাক্তার এবং চিকিৎসক জীবনে তার অন্যায় পাপের শাস্তি হিসেবে ডাক্তার দাস সারা জীবন তার কৃতকর্মের জন্য অনুশোচনার আগুনে যাতে দগ্ধ হতে পারে তার ব্যবস্থা সে করে। ডঃ দাস অনুশোচনায় দগ্ধ হতে থাকে। অসাধারণ বক্তব্য।
ডাঃ দাসের ভূমিকায় জ্যোতির্ময় চক্রবর্তী অসাধারণ অভিনয় করলেন। তার গলার মডিলিউশন, অভিনয়, সঠিকভাবে কন্ঠের ব্যবহার ও অসাধারণ স্ক্রিপ্ট নাটকটিকে এক অন্যমাত্রায় পৌঁছে দেয়। ডাঃ সুরঞ্জনা দাসের ভূমিকায় পম্পি দত্তর কন্ঠ নাটকের শুরুতে একটু নীচু স্বরে বাঁধা থাকায় মাঝে মাঝে তার কথা বুঝতে অসুবিধা হচ্ছিল।কিন্তু পরে জ্যোতির্ময় চক্রবর্তীর সঙ্গে সমানতালে তিনি অভিনয় করেন। সঞ্চিতা সিনহার বৌমা চরিত্রে আরো কিছু সংলাপ দিলে ভালো হতো। চরিত্রটা একটু অস্পষ্ট রয়ে গেল। নাটকে আবহ র প্রয়োগ যথাযথ।।
এরপর আরও কয়েকটি শ্রুতি নাটক পরিবেশিত হলো। দুর্গাপুরের বাইরের কথা বলতে পারব না কিন্তু দুর্গাপুর শহরে আজকাল বিভিন্ন সংস্কৃতি অনুষ্ঠানে প্রচুর সংখ্যক মহিলাদের উপস্থিতি চোখে পড়ে। এই দৃষ্টান্ত খুব প্রশংসার হলেও পুরুষ দর্শক ও অভিনেতা আবৃত্তিকারের সংখ্যা দিন দিন কমে যাচ্ছে। এর কারণ বুঝতে পারলাম না। এদিনের নাটকেও তার প্রমাণ পেলাম। সবগুলো শ্রুতি নাটিকাই ছিল মহিলা চরিত্র প্রধান।



