দুর্গাপুরে নানা রঙে নানা জায়গায় নানা রঙের খেলা
আমার কথা, ৩ মার্চ
প্রণয় রায়, দুর্গাপুর:

বাঙালির প্রাণের উৎসব দোল, বসন্ত উৎসব ছাড়াও রঙের উৎসব নামে পরিচিত।স্কন্ধ পুরান গ্রন্থের হোলিকা ও প্রহ্লাদের উপাখ্যানে প্রহ্লাদকে পুড়িয়ে মারতে গিয়ে হোলিকার আগুনে পুড়ে যাবার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। হোলিকা দহন থেকে এসেছে দোল বা হোলির আগের সন্ধ্যায় হোলিকা দহন বা বুড়ির ঘর পুড়িয়ে অশুভ শক্তির বিনাশ। এর পরদিন হোলি বা দোল উৎসব পালন করা হয়। আবার বৈষ্ণব বিশ্বাস অনুযায়ী দোল পূর্ণিমার দিন বৃন্দাবনে ফাল্গুনী পূর্ণিমা বা দোলের দিন বৃন্দাবনে শ্রীকৃষনা আবির বা গুলাল নিয়ে রাধিকা ও অন্যান্য গোপীদের সঙ্গে রং খেলায় মেতেছিলেন।সেই ঘটনা থেকে দোল উৎসবের সূচনা। চৈতন্য মহাপ্রভুর জন্মদিন এই দিনে।
যাক এ নিয়ে আর কথা নয়। ইতিহাসে পাওয়া যায় চন্দ্রগুপ্ত দ্বিতীয়র সময় চতুর্থ শতাব্দীতে হোলি উৎসব পালনের ইতিহাস পাওয়া যায়।ভারত ও নেপাল ছাড়া ও পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে দোল বা হোলি উৎসব পালন করা হয়।
বর্তমানে শান্তিনিকেতনের দোল উৎসবের অনুসরণে বিভিন্ন জায়গায় নাচে গানে দোল বা বসন্ত উৎসব পালন করা হয়।
রবীন্দ্রনাথ এর কনিষ্ঠ পুত্র দশ বছর বয়সী শমীন্দ্রনাথ ১৯০৭ সালের ফেব্রুয়ারীতে ,১৩১৩ এর ফাল্গুনে প্রথম ঋতু উৎসবের সূচনা করেন। এই অনুষ্ঠানে বসন্ত সেজেছিলেন শমী ঠাকুর ও আরো দুজন, বর্ষা সেজেছিলেন একজন, এবং শরৎ তিনজন। শমী ঠাকুর উদাত্ম কণ্ঠে গেয়েছিলেন তার পিতার লেখা তত্ববোধিনি পত্রিকায় প্রকাশিত একী লাবণ্যে পূর্ণ প্রাণ , প্রাণেশ হে। ঋতুরাজ বসন্তকে স্বাগত জানাতেন মূলতঃ এই উৎসাবের জন্ম। প্রথমে বসন্তের যে কোন দিন অনুষ্ঠিত হলেও, পরের দিকে শুধুমাত্র বসন্ত পূর্ণিমার দিনেই হত এই উৎসব।১৯৩২ সাল থেকে এই উৎসব বসন্ত উৎসব নামে পরিচিত হয়।শান্তিদেব ঘোষ তাঁর স্মৃতিচারণে বলেছেন১৯৩১সালের এই আসরে বসন্তের গানের সঙ্গে স্বতঃস্পুর্ত নেচে ওঠেন তিনি।সঙ্গে ছিলেন কলা ভবন এর ছাত্র বনবিহারি ঘোষ। তাঁদের সেই নাচের সুখ্যাতি গিয়ে পৌঁছায় রবীন্দ্রনাথের কানে। এর কয়েক বছর পর থেকেই আম্রকুন্জের সকালের অনুষ্ঠানে প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ শুরু হয় আশ্রম গুরু রবীন্দ্রনাথের।শান্তিদেব ঘোষের কথা অনুযায়ী সেই সময় থেকেই শান্তিনিকেতনের দোল উৎসব মাত্রা পেয়ে হয়ে বসন্ত উৎসৱ। দোল উৎসবকে নান্দনিক উৎসব হিসেবে গড়ে তোলার প্রয়োজন অনুভব করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। আজ দিকে দিকে সেই বসন্ত উৎসবের ই অনুরণন।
সকাল থেকে দুর্গাপুর শিল্পাঞ্চল রঙের হোলি খেলায় মেতে উঠে। এদিন সাত সকালে সিটি সেন্টারের চতুরঙ্গ ময়দান সংলগ্ন নন্ কোম্পানী রিক্রিয়েশন ক্লাবের প্রভাতী প্রাণায়াম ক্লাবের মহিলা শিক্ষার্থীরা রঙ খেলায়
মেতে ওঠেন। চতুরঙ্গ
ময়দানে নিয়মিত শরীরচর্চা করা
বয়স্ক মানুষদের ও তারা আবির মাখান ও সবাইকে মিষ্টিমুখ
করান।
এদিন সেল কো অপারেটিভ কলোনীর কবিগুরু রাস্তা সংলগ্ন একটি ময়দানে দুর্গাপুর কয়ার ও নব চৈতালি সব পেয়েছির আসরের পক্ষ থেকে বসন্ত উৎসবের আয়োজন করা হয়। এই দোল উৎসব উপলক্ষে দুর্গাপুরের বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংস্থা নাচ, গান ও কবিতা ও ভাষ্যপাঠে অংশ নেয়। আয়োজকদের পক্ষে শ্রী পরিমল দাস বলেন শান্তিনিকেতনের বসন্ত উৎসবের আঙ্গিকে দুর্গাপুরের বিভিন্ন সংস্কৃতিক দলকে নিয়ে এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। এই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন তার দুই শিশু কন্যাকে নিয়ে
দুর্গাপুরের মহকুমা শাসক শ্রী সুমন্ত বিশ্বাস।
দুর্গাপুরের বরিষ্ঠ নৃত্যশিল্পী মন্দিরা পাল চৌধুরী আজও সমানভাবে তার নৃত্য
দলকে নিয়ে অসাধারণ দক্ষতার সঙ্গে বিভিন্ন ধরনের নৃত্য পরিবেশন করে চলেছেন। এই অনুষ্ঠানে আজও তার নিদর্শন দেখা গেল।
দীনবন্ধু বালিয়াল ও তার সংগীত বিদ্যালয়ের সহশিল্পীদের রবীন্দ্র সংগীত পরিবেশনও ছিল খুবই মনোমুগ্ধকর।
মঞ্চের পেছনেই সকালের সূর্য জ্বলন্ত গোলার মত যত উদিত হচ্ছিলেন ততই দর্শকদের অনুষ্ঠান দেখতে অসুবিধা হচ্ছিল। তাই ভবিষ্যতে এই অনুষ্ঠানের কর্মকর্তারা কোন দিকে মঞ্চ নির্বাচন করলে দর্শকদের ও শিল্পীদের অনুষ্ঠান পরিবেশনে অসুবিধা হবে না সে বিষয়টা ভেবে দেখতে পারেন।
এডিসন মেজর পার্কে ভারত মুখ পত্রিকার পক্ষ থেকে বসন্ত উৎসবের আয়োজন করা হয়। এই উৎসবে দুর্গাপুরের কবি সাহিত্যিক ও সঙ্গীত ও নৃত্য শিল্পীরা অংশ নেন। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন অনুষ্ঠানের আয়োজক ভারত মুখ পত্রিকার সম্পাদক ও কবি নয়ন রায়, কবি স্নেহাশিস মুখোপাধ্যায় , নিখিল ভারত বঙ্গ সংস্কৃতি সম্মেলনের দুর্গাপুর শাখার প্রাক্তন কর্মকর্তা শ্রী মোহিত গাঙ্গুলী, ব্যবহারজীবী ও সংগীতশিল্পী বিপ্লব চট্টোপাধ্যায়,সঙ্গীত শিল্পী দীনবন্ধু বালিয়াল, কবি লাকি চট্টরাজ, বাচিক শিল্পী কাকলি সেন সহ অন্যান্যরা । গাছ গাছালি ঘেরা সুন্দর পরিবেশে আবিরে আবিরে উপস্থিত সবাই নিজেদের রাঙিয়ে দেন। এই অনুষ্ঠানে মহিলা শিল্পী ও মহিলা দর্শকদের সংখ্যাই ছিল বেশি।
এদিনের অত্যন্ত মনোজ্ঞ দোল উৎসবটি উদযাপিত হয় এডিসন রোডের দুর্গাপুর বলাকা মণিমেলায়। মাঠ জুড়ে সুন্দর আলপনা ও বলাকার শিশু কিশোর মনি ভাই বোনেদের রবীন্দ্রনাথের খোল দ্বার খোল লাগলো রে দোল এই গানটি অনেকটা মাঠ জুড়ে নৃত্যের সঙ্গে উপস্থাপনা ছিল খুবই উপভোগ্য। আর বড়দের সমবেত রবীন্দ্র নৃত্য রাঙিয়ে দিয়ে যাও যাও যাও গো বলে গানটির সঙ্গে সঙ্গে চারধারে আবির ছড়িয়ে সবাইকে আবির রঙে রাঙানো অনুষ্ঠানটি ছিল খুবই দৃষ্টিনন্দন ও উপভোগ্য।
এদিন এ বি এল লাকি সেভেন ও উড়ান এর যৌথ উদ্যোগে এ বি এল কলোনীর গাছগাছালির মাঝে এক মনোরম পরিবেশে মহা সমারেহে বসন্ত উৎসব উদযাপিত হল। দর্শকদের ভীড় ও পরস্পরকে আবির মাখানো ও উড়ানের শিল্পী ও কলাকুশলীদের অনুষ্ঠান পরিবেশনা সবার মধ্যে মুগ্ধতার রেশ ছড়িয়ে দেয়। সমগ্র অনুষ্ঠানটির সঞ্চালনা ছিল রাজশেখর মুখোপাধ্যায়।
ফেরার পথে ইস্পাত নগরীর সি জোনের জগন্নাথ মন্দিরে যাওয়ার রাস্তায় খোল কর্তাল নিয়ে একদল ভক্তকে কীর্তন করতে করতে জগন্নাথ মন্দিরে যেতে দেখা গেল।
সিটি সেন্টারের নন কোম্পানি হাউসিং এর সদস্যরা নন কোম্পানির রাস্তা পরিক্রমা করতে করতে সবাইকে আবির রঙ্গে রঙিন করেন। অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি পরমানন্দ চট্টোপাধ্যায় বলেন এবছর থেকে তারা দোলের দিন নন কোম্পানির প্রতিটি প্রধান রাস্তা পরিক্রমা করতে করতে সবাইকে রং খেলতে উৎসাহিত করছেন।



