সরকারের দেওয়া প্রতিশ্রুতি হয়নি পূরণ, স্বজন হারিয়ে আজও অপেক্ষায় পরিবার
আমার কথা, রাকেশ লাহা, জামুরিয়া, ১১ জানুয়ারী:
কেটেছে মাস, পেরিয়েছে বছর, মেলেনি সরকারি প্রতিশ্রুতির টাকা। পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারীকে হারিয়ে আজও সরকারের প্রতিশ্রুতির আশায় প্রহর গুনছেন পরিবারের সদস্যরা। সেই সময় দুর্ঘটনাগ্রস্থ পরিবারের পাশে এক এক দিন এক এক দলের রাজনৈতিক নেতারা ছুটে এসেছিল এবং পরিবারকে আশ্বাস দিয়েছিল যাবতীয় ক্ষতিপূরণ পাইয়ে দেওয়ার। কিন্তু আজ যখন একটি বছর কেটে গেল পরিবার পেল না সঠিক ক্ষতিপূরণ, তখন একটাই প্রশ্ন উঠছে যে সেই সময় বারবার রাজনৈতিক রুটি সেঁকতে আসা নেতারা আজ কোথায়?
প্রসঙ্গত গত বছর উত্তরপ্রদেশের প্রয়াগরাজে অনুষ্ঠিত হয় মহাকুম্ভ মেলা। যেহেতু ১৪৪ বছর পর একবারই এই মহাকুম্ভ মেলা অনুষ্ঠিত হয় সেই কারণেই অন্যান্য সকলের মত পশ্চিম বর্ধমান জেলার জামুরিয়ার কেন্দা গ্রামের বাসিন্দা বিনোদ রুইদাস সে কুম্ভে গিয়ে ইতিহাসের পাতায় সাক্ষী রাখতে চেয়েছিল। কিন্তু যে ইতিহাসের সাক্ষী রাখতে সে গিয়েছিল মহাকুম্ভে, সেখানে সে নিজেই যে ইতিহাসের পাতায় জায়গা করে নেবে, এটা স্বপ্নেও ভাবতে পারেনি বিনোদ এবং তার পরিবার সহ এলাকার মানুষজন।
আসলে গত ২০২৫ সালের ২৯ জানুয়ারি, প্রয়াগরাজের মহাকুম্ভে মৌনী অমাবস্যার পবিত্র স্নানের সময় ঘটে যায় ভয়াবহ পদপিষ্টের ঘটনা, সেখানে সরকারি হিসেবে অনুযায়ী মৃত্যু হয় ৩৩ জন পূর্ণার্থীর। তার মধ্যে পশ্চিম বর্ধমান জেলার জামুড়িয়ার কেন্দা গ্রামের বাউরি পাড়ার বাসিন্দা বিনোদ রুইদাস ছিলেন একজন।
ঘটনার পরেই উত্তরপ্রদেশ সরকার মৃত পরিবার পিছু ২৫ লক্ষ টাকা ক্ষতি পুরন দেওয়ার কথা ঘোষণা করে। সরকারের জারি করা ঘোষণা পৌঁছাই বিনোদের পরিবারের কাছেও। কিন্তু পরিবারের অভিযোগ, দুর্ঘটনার পর বিনোদের দেহ ময়নাতদন্ত রিপোর্ট বা মৃত্যু শংসাপত্র ছাড়াই এক পুলিশ সদস্যের মাধ্যমে বাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।পরে অবশ্য তীব্র প্রতিবাদের মুখে পড়ে প্রশাসন মৃত্যু শংসাপত্র প্রদান করে।
এর প্রায় তিন মাস পরে বিনোদের পরিবারের হাতে মাত্র ৫ লক্ষ টাকা দিয়ে যায় ইউ পি সরকার। বাকি অর্থ কিস্তিতে দেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হয় পরিবারকে। যেহেতু পাঁচ লক্ষ টাকা হাতে পেয়েছিল তাই বাকি টাকা কিস্তিতে দেওয়ার আশ্বাস দিলে স্বজন হারানোর ব্যথার মধ্যেও কিছুটা স্বস্তির শ্বাস পড়ে পরিবারের। কিন্তু ঘটনার প্রায় এক বছর পেরিয়ে গেলেও সেই প্রতিশ্রুতি আজও কানের কাছে বাজছে পরিবারের সদস্যদের, হাতে পায়নি পুরো অর্থ।
মৃত বিনোদ রুইদাসের বিধবা স্ত্রী কাতর সুরে জানাই, উত্তর প্রদেশের সরকার আমাদেরকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল যে ৫ কিস্তিতে পাঁচবার ২৫ লাখ টাকা পূরণ করে দেওয়া হবে। কিন্তু সেই যে ৫ লাখ টাকা দিয়ে গেছে তারপর থেকে আর পিছন ফিরে তাকাইনি প্রশাসন। বর্তমানে আমাদের অবস্থা খুবই সংকটের মধ্যে। তিনি জানান তিন ছেলে মেয়ে এবং বৃদ্ধ শশুর শাশুড়িকে নিয়ে কোন রকমে দিন কাটছে। পরিবারের উপার্জন কারী বলতে কেউ নেই। সরকারি রেশনের চাল এবং ৫ লক্ষ টাকার ৩০০০ টাকা করে এমআইসি এবং মাসিক লক্ষী ভান্ডারের টাকায় সংসার চালানো এখন দায় হয়ে পড়েছে। বিনোদ বাবুর স্ত্রী শর্মিলা দেবীর কাতর কণ্ঠে উঠে আসে একটাই কথা, “বর্তমানে আমাদের পরিবারে নুন আনতে পান্তা ফুরায় তারপর আবার তিন ছেলে মেয়ের ভবিষ্যৎ রয়েছে। সবে মিলে এখনো আমরা অপেক্ষায় রয়েছি, যদি আমাদের বাকি টাকা সরকার দেয় তাহলে আমাদের সংসারটি আবারও উঠে দাঁড়াতে পারবে।”
অন্যদিকে বাড়ির দুয়ারে বসে থাকা বিনোদের মা-বাবার মুখেও এখন একটাই প্রশ্ন “অপেক্ষা করতে হবে আর কতদিন”?



