স্বপ্নে মা দুর্গা মেয়ে হয়ে আসতেন মেনকার কাছে, তারপরেই শুরু মায়ের পুজো
আমার কথা, প্রণয় রায়, দুর্গাপুর, ৩০ সেপ্টেম্বর:
এক অন্য দুর্গা। মা দুর্গার মৃন্ময়ী মূর্তির পাশে বসে ঝরঝর করে কাঁদছে।কিছুক্ষণ আগেই সন্ধিপূজো হয়ে গেছে। মহা অষ্টমী পেরিয়ে গেল । মাঝে আর একটা দিন। তারপরই মা দুর্গা আবার এক বছরের জন্য কৈলাশে প্রতিগৃহে চলে যাবেন । ঠিক সে যেমন বর্ধমানে তার পতিগৃহে চলে যাবে। ষষ্ঠীর অপরান্হে মায়ের অকালবোধন করে নিদ্রিত দেবীকে জাগানোর পর থেকে বীরভূম থেকে আসা পুরোহিত মশাই খুব শুদ্ধাচারে তাদের আবাসনে দুর্গাপূজা করে চলেছেন। আর এই মেয়েটি সব পূজার জোগাড় দিয়ে গেছে ঠাকুর মশাই কে। ঠাকুরমশাই পুজো করছেন। মেয়েটি মাঝে মাঝে মায়ের মৃন্ময়ী মূর্তির দিকে তাকালেই যেন দেখতে পায় মৃন্ময়ী মা চিন্ময়ী রূপে তার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। মেয়েটি ভাবে এটা তার মনের বিভ্রম নয় তো। আসলে গত চার বছর ধরে ইস্পাত নগরীর দয়ানন্দ রোডের এই কোম্পানির কোয়ার্টারে এখন যা তার বাপের বাড়ি এই বাড়িতে ও দুর্গাপূজা করে চলেছে। পোশাকি নাম মিতশ্রী হলেও খুব ছেলেবেলায় পারিবারিক গুরুদেব তার নাম দিয়েছিলেন মেনকা। গুরুদেব কেন এই নাম দিয়েছিলেন তা ও বলতে পারবে না কিন্তু ছেলেবেলা থেকেই প্রতি দুর্গাপুজোর আগেই ও অদ্ভুত একটা স্বপ্ন দেখতো চারধারে কাশফুল, শরতের আকাশ, আর ঝরা শিউলির পথ ধরে অপরূপ সাজে সজ্জিত অপরূপা ও ত্রিনয়না একটি কন্যা তাদের বাড়িতে আসছে। তাকে বলছে আমি তোমার মেয়ে আমাকে ঘরে ঢুকতে দেবে না? ও দেখতো ওদের বাড়িতে মা দুর্গার প্রতিমা আনা হয়েছে। ও কলা বউ স্নান করাচ্ছে। কত পুজোর ফল। ও ফল কাটছে। মায়ের ভোগ রান্না হচ্ছে। পুরোহিত দেবী দুর্গার পুজো করছে। প্রতিবছরই দুর্গাপুজোর শুরুতেই ও ঘুমের মধ্যে স্বপ্ন দেখত ও কোথায় যেন পূজা হচ্ছে ঢাক বাজছে, কানে শুনতে পেত চণ্ডীপাঠ হচ্ছে। আর দেখতো লাল পেড়ে সুন্দর বেনারসি পরে একটি অপরূপা কন্যা পায়ে আলতা পরা হাতে অভয় মুদ্রা হাসিমুখে ওদের বাড়িতে আসছেন। ওকে যেন বলছেন মাগো আমি এসেছি আমাকে বরণ করবি না। ঠিক দুর্গা মায়ের মতো দেখতে। তখনই ওর ঘুমটা ভেঙে যেত। এরপর বাকি রাতটা স্বপ্নের মানে খুঁজে বেড়াতো। মেয়েটি একটু একটু করে বড় হতে থাকলো । বাড়লো পড়াশুনার চাপ, ক্যারিয়ার গড়ার স্বপ্ন। কিন্তু পুজো এলেই এই স্বপ্নটা ওকে ভীষণ জ্বালাতো। কাউকে বলতে পারত না। মনের কথা মনেই লুকিয়ে রাখত।
একদিন বড় হল।। কলেজের পড়াশুনো সাঙ্গ হোলো।চার্টার্ডের প্রিলিমিনারি কোর্সটাও সম্পূর্ণ হলো। একটা চার্টার্ড ফার্মে চাকরিও হলো। একদিন বিয়েও হল স্বামী দুর্গাপুরে একটি বেসরকারি ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে লেকচারার।
মেয়েটি মানে মীতশ্রী বা মেনকার চাকরি স্থল বর্ধমানেই। কিন্তু বিয়ের পর পুজো এলেই সেই পুজো করার স্বপ্নটা বাড়তেই থাকলো। প্রতিবছর পূজো এলেই ছেলেবেলা থেকে বড় বেলা পর্যন্ত স্বপ্নে দেখা সেই দেবীর ঘটে জল ভরা, কলাবৌ স্নান করানো আর কন্যা রূপে মা দুর্গাকে ওর স্বপ্নে দেখতেই থাকলো। এতদিন পারেনি। সে ওর স্বপ্নটার কথা প্রথমে ওর স্বামীকে খুলে বলে। দুর্গাপুরে মা মৃদুলা রায়চৌধুরী ও বাবা নান্টু রায়ের চৌধুরী থাকেন আর থাকে ওর ছোট ভাই। ওদের কাছেও মিতশ্রী ও ওর এই স্বপ্নের কথাটা বলে । ওর ভাই বলে কি সাংঘাতিক ব্যাপার রে দিদি। তুই এতদিন কিছু বলিস নি তো।মা দুর্গা তোর কাছে মেয়ে হয়ে আসেন? কৃষ্ণমন্ত্রে দীক্ষিত পরিবারটি রাজি হয়ে যায় মেয়ে মিতশ্রীর সেই ছেলেবেলা থেকে দুর্গাপুজো করার স্বপ্ন পূরণে। তার শ্বশুর বাড়ি ও বাপের বাড়ির সবাই মিলে ঠিক করেন দুর্গাপুরের দয়ানন্দের আবাসনে তাদের মেয়ের স্বপ্ন পূরণের দুর্গাপুজো করা হবে। সেই থেকে এই পুজো চার বছরে পড়ল। খুব নিষ্ঠার সঙ্গে শাস্ত্র মেনে এই পুজো করেন বীরভূম থেকে আসা এক পন্ডিত ব্রাহ্মণ পুরোহিত।
প্রথম বছরের পূজো করার পরে মেয়েটির এতদিনের দেবী বন্দনার স্বপ্ন পূরণ হল।ওর মনে হলো ওর ভক্তিতে মৃন্ময়ী মা চিন্ময়ী রূপে ওদের বাড়িতে উপস্থিত হয়েছেন। ওর এই ভক্তি ভাব দেখে ওর পরিবারের সবাই বলল প্রতিবছরই এই কোয়ার্টারে দুর্গাপুজো হবে। দ্বিতীয় বছরের পুজো থেকে ওদের আমন্ত্রণ চণ্ডীপাঠ করতে গিয়ে দেখলাম নাইবা থাকলো ঘরোয়া পূজায় কোন আড়ম্বর।কিন্তু বাড়িটি জুড়ে একটা স্নিগ্ধ, পবিত্র ও মঙ্গলময় ভক্তির পরিবেশ এ বাড়ির পুজোটাকে একটা অন্যরকম মাত্রা দিয়েছে। প্রতিবছরই ওই বাড়িতে দুর্গাপূজার সময় একদিন চণ্ডীপাঠ করতে যাই আর মনে মনে ভাবি অনেক জায়গায়ই তো পুজোর সময় চণ্ডী পাঠ করি কিন্তু এত প্রাণ এত ভক্তি রস এত আবেগ অন্য কোথাও পাই না। সত্যিই আজকের এই ভীষণ ব্যস্ততার জীবনে কেউ হয়তো এই ধরনের অলৌকিক কাহিনী বিশ্বাস করবেন না। কিন্তু অঘটন তো আজও ঘটে।



