কারাগৃহের জীবন পেরিয়ে ছোট্ট রামকৃষ্ণের আবৃত্তি চোখে জল আনলো ‘কথা ও কাহিনীর’ অনুষ্ঠানে
আমার কথা, ২৯ জানুয়ারী
প্রণয় রায়, দুর্গাপুর:
একটি শিশু কচি কন্ঠে আবৃত্তি করছিল আতা গাছে তোতা পাখি ডালিম গাছে মৌ। একদম না থেমে ও মাইকের সামনে কবিতাটা বলে যাচ্ছিল। পাশে দাঁড়িয়েছিল ওর মা। মায়ের মুখটা গর্বে ভরে উঠছিল । কিন্তু যারা মঞ্চের আশেপাশে চেয়ারে বসে অনুষ্ঠানটি শুনছিলেন তাদের সবার চোখে জল। কিছুক্ষণ আগেই অনুষ্ঠান সঞ্চালক হৃদয় সাঁই বলল আসুন এখন আমরা এমন এক কচি শিশু কন্ঠে আবৃত্তি শুনবো যার নাম রামকৃষ্ণ। ও এসেছে পুরো কথাটা ও বলতে পারল না একদলা কান্নায় ওর গলা বুজে আসছিল। পাশে দাঁড়িয়ে ছিল জয়িতা সাঁই। ও একনাগাড়ে আঁচল দিয়ে চোখ মুছছিল। আমরা যারা বসে বসে বিধান নগরের ক্লাব স্যান্টোসের মাঠে অস্থায়ী স্টেজের সামনে বসে কথা ও কাহিনীর সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও পিঠে পুলি উৎসবের শেষ দিনের অনুষ্ঠান দেখছিলাম তাদের কারো মুখে কোন কথা নেই। কিছুক্ষণ আগেই জয়িতা ঘোষণা করেছিল এবার এমন একজন শিশুকে আমরা মঞ্চে আমন্ত্রণ জানাচ্ছি যে শিশুটির জন্ম ও নিবাস বর্ধমান কেন্দ্রীয় সংশোধনাগরের গারদের অভ্যন্তরে । ওর মা বাবা দুজনেই যাবজ্জীবন সাজা প্রাপ্ত আসামী।
ওদের সংশোধনাগারের ভেতরে সাজাকালীন জীবনেই আলাপ ও বিয়ে ও সেখানেই সংসার। ওখানেই ওদের একমাত্র সন্তান রামকৃষ্ণর জন্ম। সংশোধনাগারের ভেতরেই ও পড়াশোনা করে ও এভাবেই বেড়ে উঠছে।
গত চারদিন ধরে বিধান নগরের ক্লাব স্যানটোসের মাঠে কথা ও কাহিনীর সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান
ও পিঠে পুলি উৎসব চলছে। প্রতিদিন দুর্গাপুরের বিভিন্ন সংস্কৃতিক সংস্থা এখানে নানান অনুষ্ঠানের ডালি নিয়ে জমিয়ে দিয়েছে কথা ও কাহিনীর বার্ষিক অনুষ্ঠান।
অনুষ্ঠানের প্রথম দিন শত কন্ঠে রবীন্দ্রনাথের বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের সময় লেখা আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি ও বাংলার মাটি বাংলার জল এই দুটো দেশাত্মবোধক গান দিয়ে অনুষ্ঠান শুরু হয়েছিল। অনুষ্ঠানে আলোকিত করে উপস্থিত হয়েছিলেন দুর্গাপুরের বিভিন্ন গুণী মানী মানুষেরা। এরপর প্রতিদিন চলতে থাকে নানান ধরনের অনুষ্ঠান। সাথে সাথে রক্তদান শিবির, সমাজের দরিদ্র শিশুদের জামাকাপড় ও পড়াশোনার
সামগ্রী দান, বয়স্ক মানুষকে শীতের কম্বল দান সহ আরো আরো অনেক কর্মসূচি। কথা ও কাহিনী শুধু আবৃত্তি ও শ্রুতি নাটক, নাচ গান ইত্যাদি শেখানোর প্রতিষ্ঠান নয়। সারা বছর নানান রকম সামাজিক কর্মকাণ্ড নিয়ে ব্যস্ত থাকে এই সংস্থার দুই কর্ণধার হৃদয় সাঁই ও জয়িতা সাইঁ। ওরা দুর্গাপুর মুক্ত সংশোধনাগারের বন্দীদের আবৃত্তি ও নাটকের প্রশিক্ষণ ও দেয়।
এবার কথাও কাহিনীর সাংস্কৃতিক উৎসবের শেষ দিনের শেষ অনুষ্ঠান ছিল বর্ধমান কেন্দ্রীয় সংশোধনাগরের যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত কয়েদিদের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান । পুরুষ ও মহিলা বন্দী মিলিয়ে মোট দশ জনের একটি দল এদিন আবৃত্তি নৃত্য ও রবীন্দ্রনাথের চিত্রাঙ্গদা নৃত্যনাট্যের অংশবিশেষ পরিবেশন করল। কি অপূর্ব ওদের পরিবেশনা । শুনলাম প্রখ্যাত নৃত্যশিল্পী ও কোরিওগ্রাফার ও সমাজকর্মী অলকানন্দা রায় ওদের অনুপ্রেরণা। অলকানন্দা রায় প্রেসিডেন্সি সংশোধনাগারে সেখানকার বন্দিদের সমাজের মূল স্রোতে ফিরিয়ে আনতে তাদের দিয়ে নানান ধরনের অনুষ্ঠান করেছেন।তার মধ্যে অন্যতম বাল্মিকী প্রতিভা। তার সান্নিধ্যে এসে নাইজেল সহ অনেক বন্দী আজ সমাজের মূল স্রোতে ফিরে এসে প্রতিষ্ঠিত ও হয়েছে।
বর্ধমান কেন্দ্রীয় সংশোধনাগারে সমাজকর্মী ও নৃত্যশিল্পী নীলাক্ষী দেবী এখানকার বন্দীদের সমাজের মূল স্রোতে ফিরিয়ে আনতে নানান ধরনের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, পড়াশুনা,যোগা ইত্যাদির মাধ্যমে সমাজের মূল স্রোতে ফিরিয়ে আনতে ওটা তো কোথায় চলে যাচ্ছে নিরন্তর প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছেন। তিনি সফল ও হচ্ছেন। তারই কিছুটা ছবি সবাই দেখতে পেলাম কথা ও কাহিনীর সাংস্কৃতিক উৎসবে।
ওদের অনুষ্ঠান শুরু হওয়ার আগে হৃদয় সাঁই গ্রীনরুমে ওরা যেখানে চিত্রাঙ্গদা নৃত্যনাট্যের চরিত্র রূপায়ণের জন্য সাজ সজ্জা করছিল সেখানে আমাকে নিয়ে গেল। হৃদয় বর্ধমান সংশোধনাগারের চীফ হেড ওয়ার্ডেন ইজাজ আহমেদ সাহেবের অনুমতি নিয়ে আমাকে ওদের সঙ্গে কথা বলার জন্য নিয়ে গেল। ভিতরে গিয়েই আলাপ হল মনুয়া মজুমদারের সঙ্গে। আজকের অনুষ্ঠানে এরা সবাই যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত বন্দী । মনুয়া আমাকে বলল আপনি প্লিজ আমাদের অতীত জীবন নিয়ে কোন প্রশ্ন করবেন না। আমি বললাম আমি কিন্তু আপনার ছেড়ে আসা দুঃস্বপ্নের দিন নিয়ে কোন কাহিনী লিখতে আসিনি। আমি এসেছি আপনাদের মধ্যে সুন্দরভাবে বাঁচার যে উত্তরণ হয়েছে, সুন্দরভাবে বাঁচার যে স্বপ্ন আপনারা দেখছেন তারই অন্বেষণ করতে এসেছি । মনুয়া একটা শ্বাস ফেলে বলল বন্দী জীবন কারো ভালো লাগেনা। কিন্তু এই বন্দী জীবনে হাতের কাজ ও কালচারাল কর্মকাণ্ড আমাদের বাঁচবার অনুপ্রেরণা যোগায়। এই বন্দী জীবনে যুক্ত থেকেও আমি যে কালচারাল কাজগুলোতে যুক্ত আছি প্রোগ্রামিং বলুন বা হাতের কাজই বলুন সব রকম বৃত্তিমূলক কাজে জড়িত থেকে মুক্তির আনন্দ পাই। এই কাজগুলো আমাদের অনুপ্রেরণা যোগায় মূল স্রোতে ফিরিয়ে আনতে। আমার প্রশ্নের উত্তরে মনুয়া বলল এদিনের অনুষ্ঠানে ওরা বিভিন্ন গানের কোলাজ ও চিত্রাঙ্গদা নৃত্যনাট্যর অংশবিশেষ পরিবেশন করবে। সমাজকর্মী নিলাক্ষী ম্যাম ওদের এসব শিখিয়ে ওদের জীবনের অনেক পরিবর্তন ঘটিয়েছেন। ও বললো গান খুব একটা করে না তার প্রথম ভালোবাসাই নাচ। আসলে সে ছেলেবেলা থেকেই নাচ করতে ভালোবাসতো ও পরে একজন পেশাদার নৃত্যশিল্পী হিসাবে পরিচিত হয় এখানে এসে এই সংশোধনাগার এর কর্তৃপক্ষ ও ওয়ার্ডেন সাহেবদের সহযোগিতায় সংশোধনাগারের ভেতরে আমার সহ বন্দীদের নাচ শেখাই। নীলাক্ষী ম্যাম ও আমাদের সাহায্য করেন। এরপর বলল যেহেতু নাচের সঙ্গে আমি যুক্ত আছি, নাচের মধ্যে দিয়ে বাঁচি এবং নাচ আমাকে আনন্দ দেয় ও একটা উত্তরণের পথ দেখায়। ভবিষ্যতে সুযোগ পেলে এই নাচ নিয়ে আমি এগিয়ে যাব। তার এই অবস্থার জন্য মনুয়া সমাজকে দায়ী করে না সে বলল আমার ডেসটিনি আমাকে যেদিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে চায় আমি সেদিকেই যাব। এখানে ভালোই আছি। এখানে মুক্তির আনন্দ পাই নানান রকম বৃত্তিমূলক কাজে কারাগারের চার দেয়ালের মধ্যে। আমরা কৃতজ্ঞ আমাদের জেল কর্তৃপক্ষের কাছে যারা আমাদের সমাজের মূল স্রোতে নিয়ে যাবার জন্য অক্লান্ত পরিশ্রম করছেন। মনুয়ার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল আরেকজন যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত বন্দী স্বপন সিকদার। স্বপন বলল বাইরের জীবনের অনেক কিছুই এখানে হয়তো পাইনা । কিন্তু এখানে এমন অনেক কিছু পেয়েছি তা হয়তো বন্দী জীবনের বাইরে থেকে বাইরের জগতে পেতাম না। এখানে নানা রকম কাজকর্মের মধ্যে থাকি বলে আনন্দেই দিন কাটে। আবার বাইরে যেতে ও ইচ্ছে হয়। এ দুটোই ইচ্ছে আমাকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। আমি এমন একটা অবস্থায় এখানে আছি যাতে আমার মনে হয় যেদিন এখান থেকে মুক্তি পাব সেদিন বাইরের জীবনের মুক্তির আনন্দ উপভোগ করব । কিন্তু এখানকার এই সুন্দর জীবনও মিস করবো। এখানে চাষবাস খেলাধুলো, কবিতা ও গল্প লেখা গান নানান কাজকর্ম ও বন্ধুদের সঙ্গে গল্প করে দিন কাটে।
এরপর স্বপন সিকদার উজ্জ্বল মুখে বলল এখানে এসে আমি যোগা শিখেছি। যোগা আমাকে সুস্থ রাখে আমার মনের সাহস বাড়ায় মানসিক প্রশান্তি দেয়। আমাকে একটা মাইক্রোফোন দিলে আমি পাঁচশ লোককে যোগা সম্পর্কে শিক্ষা দিতে পারি ও সবার সামনে যোগা করতে পারি। আমি জিজ্ঞেস করলাম আপনি কি এখানে আপনার সহ বন্ধুদের যোগা শেখান। স্বপন বলল শিখাতাম। এখন শীতকাল বলে বন্ধ আছে। আসলে একটু বড় জায়গা পেলে সবাইকে যোগা শেখাতে পারতাম।
স্বপনের ভবিষ্যৎ স্বপ্ন যোগা নিয়ে
এগিয়ে যাওয়া ও সাহিত্য চর্চা করা। প্রশান্ত হেমরম দীর্ঘদিন সংশোধনাগারের অন্দরে থেকে তার ভালো কাজের জন্য এখন সারাদিন সংশোধনাগারের বাইরে রোজকারের জন্য চাষবাস করে বিভিন্ন রকম কাজ করে সন্ধে হলে আবার সংশোধনাগারে ফিরে আসে। সাধন লেট, তনু মাল, বৈশাখী হেমব্রম সবাই সংশোধনাগারের সাংস্কৃতিক কর্মযজ্ঞে জড়িত। আজ ওরা আবৃত্তি নাচ গান করবে ও চিত্রাঙ্গদা নৃত্যনাট্য অংশবিশেষ পরিবেশন করবে । ওরা সবাই ওদের সংশোধনাগারের ওয়ার্ডেন
সাহেবদের সম্পর্কে বলছিল। স্যারেরা আমাদের কাছে আদর্শ। আমাদের পরম মমতা নিয়ে ভালোবাসেন। আমাদের ভালো-মন্দ নিয়ে সারাদিন ভাবনা চিন্তা করেন।
আলাপ হল চীফ হেড ওয়ার্ডেন ইজাজ আহমেদ ওয়ার্ডেন অদৃশ রায়, পার্থ কোলের সঙ্গে।
সবাই এই বন্দীদের নানা দেখলাম খুব ভালোবাসেন। ওরা চান এরা সবাই একদিন ওদের ভালো কাজের মাধ্যমে সমাজের মূল স্রোতে ফিরে যাক। এদের সবাইকে ওরা আপন জনের মত যত্ন নিয়ে দেখাশোনা করেন। ইজাজ আহমেদ সাহেব বলছিলেন আজকাল এমন হয়েছে আমরা ছুটি নিয়ে বাড়ি গিয়েও থাকতে পারিনা চলে আসি এদের টানে। আর আর আমরা কদিন না থাকলেই সব বন্দীর মুখ ভার।
কচি কন্ঠে রামকৃষ্ণর আবৃত্তি দিয়ে সংশোধনাগরের বন্দীদের অনুষ্ঠান শুরু হল। রাত বাড়ছিল।একটু শীত শীত ও করছিল । বন্দিদের সমবেত নাচ শুরু হলো । এরপর এদিনের মূল আকর্ষণ চিত্রাঙ্গদা নৃত্যনাট্যের অংশবিশেষ পরিবেশিত হবে। কিন্তু আমাকে অনেক দূর যেতে হবে। ফেরার ও সমস্যা হবে। তাই বেরিয়ে এলাম। রামকৃষ্ণর কচি মুখটা খুব মনে পড়ছিল। মনে পড়ছিল মনুয়া আর স্বপন শিকদারের কথা। জীবনে আজ অব্দি অনেক অখ্যাত বিখ্যাত মানুষের সাক্ষাৎকার নিয়েছি। কিন্তু বন্দীশালার অন্দরমহলে থাকা মুক্তির স্বপ্ন দেখা মানুষগুলোকে নিয়ে এর আগে কখনো কোন সাক্ষাৎকারের সুযোগ পাইনি। মনে মনে জীবন দেবতার কাছে প্রার্থনা জানালাম তোমরা ভালো থেকো তোমাদের উত্তরন হোক।



